শতবর্ষী নুরজাহানের রাত কাটে গরুর সঙ্গে জরাজীর্ণ গোয়ালঘরে

বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। কানে কম শোনেন, চোখেমুখে স্পষ্ট বার্ধক্যের ছাপ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেখানে একজন মানুষের প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসা, সেখানে শতবর্ষী নুরজাহান বেগমের দিন কাটছে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে। গত প্রায় ৩০ বছর ধরে বাবার বাড়ির একটি জরাজীর্ণ গোয়ালঘরেই দুটি গরুর সঙ্গে বসবাস করছেন তিনি। জীবিকা চলে মানুষের কাছে হাত পেতে।
বিজ্ঞাপন
নুরজাহান বেগম বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ভরপাশা ইউনিয়নের মৃত তোজন্বর মোল্লার মেয়ে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর আর নিজের জন্য আলাদা কোনো নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে গরু রাখার ওই ঘরটিই তার আশ্রয়।
চার ভাইয়ের একমাত্র বোন নুরজাহান। আপনজন থাকলেও তাদের ঘরে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ফলে জীবনের শেষ সময়ে দুটি গরুই যেন তার নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিন গরু দুটিকে নিয়ে মাঠে যান তিনি। বয়সের কারণে চলাফেরায় কষ্ট হলেও জীবিকার তাগিদে এই কাজ করতে হয়।
সন্ধ্যা হলে আবার ফিরে আসেন জরাজীর্ণ সেই গোয়ালঘরে। ঘরটির ওপরের টিনের চালা না থাকায় বৃষ্টির সময় দুর্ভোগ চরমে ওঠে। ছেঁড়া পলিথিন দিয়ে কোনোভাবে ঘর ঢাকার চেষ্টা করা হলেও বৃষ্টির পানি ঠেকানো যায় না। বৃষ্টির রাতে ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়লে কখনো ছাতা মাথায় দিয়ে, আবার কখনো ভেজা পরিবেশেই রাত কাটাতে হয় তাকে।
বিজ্ঞাপন
শতবর্ষী এই নারীর একমাত্র মেয়ে হেলেনা। অনেক আগেই তার বিয়ে হয়েছে। তবে মেয়ের নিজের সংসারেও অভাব থাকায় নিয়মিত মায়ের দেখাশোনা বা প্রয়োজনীয় সহায়তা করা সম্ভব হয় না বলে জানা গেছে।
নুরজাহান বেগমের জীবনযাত্রার আরেকটি বড় সংকট খাবারের নিশ্চয়তার অভাব। প্রতিদিন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যা পান, তা দিয়েই কোনোরকমে দিন চলে। কখনো খাবার জোটে, কখনো অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়। বয়সজনিত নানা অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতা থাকলেও চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই তার।
নিরাপদ থাকার জায়গা, নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসা—তিনটিই এখন নুরজাহান বেগমের জন্য বড় প্রয়োজন। স্থানীয়দের ভাষ্য, জীবনের এই শেষ বয়সে এসেও তিনি এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। তবে তিনি বয়স্ক ভাতা বা অন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আছেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয়।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, শতবর্ষী একজন অসহায় নারীর জন্য অন্তত একটি নিরাপদ ঘর, নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামর্থ্যবান মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে নুরজাহান বেগমের অসহায়ত্বের বিষয়টি জানার পর বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র পাল বলেন, নুরজাহানের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সরকারিভাবে তাকে সহায়তা করা হবে।
নুরজাহান বেগমের সহায়তার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে বিকাশ ও নগদ নম্বর: 01630124585 দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন শতবর্ষী নারী যেন বৃষ্টির রাতে গোয়ালঘরে অনিরাপদ অবস্থায় না থাকেন—এমন একটি নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তার প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।








