খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় লতিফায়ে কালব ও রূহের ভূমিকা

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে শাহ্সূফি হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহত লতিফাসমূহের পরিচিতি بسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ রূহের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যঃ
বিজ্ঞাপন
রূহ এক নূরানী, জ্যোতির্ময় ও অনুভবকারী চেতন পদার্থ। সকল প্রকার সৃষ্টির সহিত ইহার সম্পর্ক আছে। তবে উহার আকার প্রকার না থাকায় বর্ণনা করা সুকঠিন। এই রূহ স্থায়ী ও শরীরের অবস্থা পরিবর্তক, কিন্তু শরীরের বিনা সাহায্যে রূহ নিজের পূর্ণ ক্ষমতা প্রকাশ করিতে পারে না।
রূহের সকল প্রকার সৃষ্টির সহিত সম্বন্ধ আছে, তবে সেই সম্বন্ধ সমভাবের নয়। কাহারও উপর রূহ সদা আবির্ভূত রহিয়াছে। কাহারও উপর ক্ষণস্থায়ী ভাবে আবির্ভূত হইতেছে। এই সমস্ত কারণে সমস্ত সৃষ্টি পদার্থই বেহেশত ও দোযখের সুখ-দুঃখ ভোগী হইবে না।
মানুষের রূহকে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামিন সর্বশ্রেষ্ঠ করিয়া উহাকে কালব, সের, খফি ও আখফার মারেফাত দান করিয়াছেন। বুদ্ধিকে উহার উজির রূপে সৃজন করিয়াছেন। এই জন্য সকল মানুষ পাপ ও পুণ্যের ফলভোগী হইবে।
বিজ্ঞাপন
কালবকে বলা হইয়াছে নাফসে নাতেকা, কারণ কালবের সহিত নাফসের সম্পর্ক যেই রূপ, রূহের সহিত ইহার সম্পর্ক সেই রূপ। রূহ ইহার অন্তর্দেশ, নাফস ইহার বহির্দেশ বা ছওয়ারী। সুতরাং উভয় পার্শ্বে সংলগ্ন নামেও উহা অভিহিত হইয়া থাকে।
অন্য জীবসমূহের রূহসমূহকে উক্ত রূপে কালব, সের, খফি ও আখফার মারেফাত ও কামালিয়াত প্রদান করা হয় নাই এবং উহাদের বিবেচনা শক্তিও দেওয়া হয় নাই। এই জন্য ঐ সকল রূহ বেহেশত বা দোযখ ভোগী হইবে না। তবে আসহাবে কাহাফ দিগের কুকুর ও ঐ ধরণের জন্তুর বেহেশতবাসী হওয়া সংসর্গজনিত কারণে বলিয়া জানিতে হইবে, তাহাদের নিজ নিজ কর্মফলে নয়। আর উদ্ভিদ ও অন্যান্য জড় পদার্থ সমূহের উপর ঐ রূহের আবির্ভাব ক্ষণস্থায়ী। এজন্য কেয়ামতের দিনে উহাদের প্রতিফল ভোগ করিতে হইবে না।
রূহ এক কিংবা সৃষ্টি জীবের সংখ্যা অনুযায়ী বহু সংখ্যক-এ সম্বন্ধে মতভেদ রহিয়াছে। শেখ আবু বকর কহতরী (রঃ) ছাহেব ও অপর কেহ কেহ কুরআন শরীফের এই আয়াত 'রূহ আমে রাব্বি বা প্রতিপালন কর্তার আদেশ' হইতে এই অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন যে, রূহ প্রতিপালকের আদেশের মধ্যে একটি আদেশ। আদেশ আল্লাহপাকের বাক্য ও তাঁহারই গুণ। উহা খোদাতায়ালার 'কুন' আদেশের অন্তর্গত বস্তু নহে। সুতরাং রূহ শব্দ দ্বারা খোদাতায়ালার গুণসমূহের মধ্য হইতে চেতন গুণকে বুঝিতে হইবে। যে সময় মানুষের শরীর উপযুক্ত হয়, ঐ চেতন গুণের প্রতিবিম্ব উহাতে পড়িয়া চেতনা প্রাপ্ত হয়। যেমন আয়নার মধ্যে সূর্যের প্রতিবিম্ব পতিত হয়। পানি যেমন সমুদ্রে মিশ্রিত হইয়া বিলুপ্ত হইয়া যায়। তেমনি ঐ প্রতিবিম্ব মূল চেতন গুণে মিশ্রিত হইয়া বিলুপ্ত হইয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
অন্য সকল উক্ত আয়াত হইতে এই অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন যে, রূহ আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট বস্তু মধ্য হইতে অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার কুন বা কোন্ আদেশ হইতে রূহের সৃষ্টি হইয়াছে। কিন্তু এই শেষোক্ত অর্থ গ্রহণকারীদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রহিয়াছে। কেহ কেহ বলেন, রূহ প্রথম সৃষ্টি, প্রকৃতই ইহা এক বস্তু, উহাই হকিকতে মুহাম্মদী ও আলে কুল। আর যাহারা রূহের সংখ্যা সৃষ্টির পরিমাণে অসংখ্য বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাদের মধ্যেও বিস্তর মতভেদ রহিয়াছে। হযরত আবু আবদুল্লাহ নাচ্ছাজ (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, রূহ এক পবিত্র সূক্ষ্ম বস্তু, যাহা এক মলিন বস্তুর মধ্যে রাখা হইয়াছে। সাধারণ লোকের ধারণা, যাহার দ্বারা শরীর জীবিত থাকে তাহাকে রূহ বলে। কেহ কেহ বলেন, রূহ এক পবিত্র সূক্ষ্ম বস্তু যাহা হইতে অনুভব করা, স্বাদ গ্রহণ ও পরিচালনা শক্তি প্রকাশ পায়।
কেহ কেহ বলেন, রূহের দুই শরীর। যথাঃ ভৌতিক ও মেছালী। ভৌতিক শরীর বিনষ্ট হইলে রূহ মেছালীকে অধিকার করে; উহা নষ্ট হয় না। এ জন্য মৃত্যুর পর লোকদিগকে (স্বপ্ন, কাশফ ইত্যাদির মাধ্যমে) পূর্বের আকারে দেখা যায়। আর রূহ ছুরাতে মেছালীতে থাকিয়া ভৌতিক শরীর প্রতিপালনে ক্ষমতাবান। এই ক্ষমতা না থাকিলে নিদ্রাবস্থায় রূহ ঘুরিতে পারিত না। মেছালী সহ ছায়ের করিতে গেলে এই শরীর বিনষ্ট হইত। কোন কোন ওলী-আল্লাহগণ ও তাপসবর্গ যে ১০/২০ দিবস বা তাহারও অধিক সময় এই শরীর ত্যাগ করিয়া ছায়ের রত রহিয়াছেন-তাহা পারিতেন না, বরং ঐ সময়ের মধ্যে তাঁহাদের শরীর বিনষ্ট হইয়া যাইত ও তাঁহারা মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িতেন। কারণ এই দেহের বিনাশ হওয়াকেই মৃত্যু বলে। এই মেছালীসহ ছায়ের করা অভ্যাস দ্বারাই সিদ্ধ হয়। প্রত্যেক বস্তু ও ব্যক্তিরই এক এক রূহ রহিয়াছে। ঐ পবিত্র রূহ কর্তৃক শরীর জীবিত থাকে।
আল্লাহপাক হযরত আদম (আঃ) এর রূহ নিশ্চয়ই আপন সদৃশ নিরাকার করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। সৃষ্টির সহিত আল্লাহপাকের যে প্রকার সম্পর্ক রহিয়াছে, শরীরের সহিত রূহের ঐ প্রকার সম্বন্ধ আল্লাহপাক স্থাপন করিয়াছেন। যেমন খোদাতায়ালা হইতে সৃষ্টি স্থাপিত আছে, ঐ রূপ রূহ হইতে সমস্ত শরীর বরং রেণু রেণু কণা কণা স্থাপিত আছে। খোদাতায়ালা রূহকে কায়েম করিয়া সমস্ত সৃষ্টিকে কায়েম করিয়াছেন। খোদাতায়ালার অনুগ্রহ জ্যোতি প্রথমে রূহের উপর পতিত হইয়া পরে শরীরের উপর পড়ে। কারণ নিরাকার নিরাকারের জ্যোতি ধারণে ক্ষমতাবান, আকার সম্বন্ধ শরীরের এই ক্ষমতা নাই। খোদাতায়ালা বলিয়াছেন,
বিজ্ঞাপন
لا يَسْعُنِى اَرْضِي وَ لاَ سَمَاءِ وَ لَكِنْ يَسْعُنِي قَلْبُ عَبْدِي الْمُؤْمِنِ.
অর্থাৎ-"আমাকে না আমার জমিন ধারণ করিতে সমর্থ, না আমার আসমান; কিন্তু আমাকে ধারণ করিতে পারে আমার মুমিন বান্দার দেল।"
এই স্থলে জানা কর্তব্য যে, কাফেরদের দেলে ঐ চেতন গুণ সম্পন্ন নূর পতিত হইবে না। কারণ তাহাদের দেল পাপ কলুষিত নাফসের সংসর্গ বসতঃ আরশের উপর হইতে নিম্নে পতিত হইয়া ছিজ্জিন অভিমুখে গমন করিতেছে। সুতরাং কাফেরদের রূহের নিরাকার ক্ষমতা একেবারে বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে। মুমিনদিগের রূহ নিম্নে অবস্থান সত্ত্বেও ঈমানের পবিত্রতা হেতু উহার নিরাকার স্বভাব বিনষ্ট হয় নাই। জানা কর্তব্য যে, রূহ যদিও নিরাকার কিন্তু সৃষ্টিস্থিত জড় বস্তুর মধ্যে আসাতে প্রকৃত পক্ষে উহা রূহকে সীমার মধ্যে অন্তবর্তী রাখিয়াছে।
বিজ্ঞাপন
রূহকে আবার আকার বিশিষ্ট সৃষ্টি ও নিরাকার খোদাতায়ালার মধ্যস্থ বলিয়াও বর্ণনা করা হইয়াছে। রূহকে আকার সংলগ্ন অবস্থায় আকার রূপে ও নিরাকার সংলগ্নে নিরাকার গুণ অর্পিত হইয়াছে। কারণ কেবল মাত্র নিরাকার হইলে উহাতে আকারের কোন অধিকার থাকিত না। পরে ঐ আকারধারী নাফস সংলগ্ন রূহকে মধ্যবর্তী ব্যবধান সমূহ অতিক্রম করিয়া স্বীয় মূলে উপস্থিত হইবার জন্য কালব নামক লতিফা ঐ লতিফা খোদাতায়ালার জাতি নূরের ক্রিয়া দান করা হইয়াছে। ঐ সমূহের সীমা পর্যন্ত উঠিয়া ঐস্তানে ফানা হইবে। পরে ইহারও উপরে গমনের জন্য সের নামক লতিফা প্রদত্ত হইয়াছে। উহা দ্বারা আল্লাহতায়ালার নাম ও শানের সীমা পর্যন্ত উপস্থিত হইতে পারিবে। উক্ত লতিফা সকলের মূল আরশের উপর আছে বলিয়া পীরানে পীরগণ ঐ সমস্ত লতিফাকে লা-মাকানী বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন।
'রূহ' যে পর্যন্ত নাফস ও শরীরের সহিত সম্পর্ক না রাখিবে, সে পর্যন্ত ঐ লতিফার কোন গুণ প্রকাশ পাইবে না। রূহ যেমন বিনা শরীরে নিজে প্রকাশ পায় না; সেই রূপ সের, খফি, আখফা লতিফা সমূহেরও কোন গুণ প্রকাশ পায় না। কারণ এই সকল লতিফা রূহের গুণ ও শক্তি মাত্র।
এই বিরাট তত্ত্ব পীরে কামেলের অছিলা ব্যতীত কেহ লাভ করেন নাই, লাভ করা সম্ভবও নয়। তাই আল্লাহ বলেন,
বিজ্ঞাপন
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ
অর্থাৎ-"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁহাকে পাওয়ার জন্য অছিলা অন্বেষণ কর।" (সূরা মায়েদাহঃ ৩৫)
খোদাপ্রাপ্তি সাধনায় লতিফায়ে কালব ও রূহের ভূমিকাঃ
বিজ্ঞাপন
লতিফায়ে কালব এবং রূহ পীরে কামেলের পাক তাওয়াজ্জুয়ে এত্তেহাদী দ্বারা যখন এক হইয়া যায় তখন আরশের উপর হইতে সিফাতে এজাফিয়ার গুণাগুণ লাভ করে এবং আলাহতায়ালার সিফাতে হাকীকীর গুণের অধিকারী হয়। তখন লতিফায়ে রূহ ও কালব আল্লাহতায়ালার নূরের সমুদ্রে পরিণত হয়, যাহার কূল কিনারা কেহ পান নাই, পাওয়াও সম্ভব নয়। তাই মহাকবি
হাফেজ (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, "কত নৌকা, কত কিস্তি এই সমুদ্রের মধ্যে ডুবিয়া গেল, যাহার একটি তক্তাও আর ভাসিয়া কিনারায় আসে নাই।"
ছালেক যখন এই দরজায় উপনীত হয়, তখন বিভিন্ন রকম ফয়েজ রূহ ও কালব-এর যোগাযোগে তাহার নাফসের উপরে পড়ে। তখন নাফস আস্তে আস্তে স্বীয় দোষসমূহ ভুলিয়া প্রথমে নাফসে লাওমা ও পরে মুৎমাইন্নায় যায়, নাফস আল্লাহর গুণে গুণে গুণান্বিত হয়, তখন নাফস পবিত্রতা নিয়া আল্লাহতায়ালার দিকে ঘোরে। আল্লাহতায়ালার বন্দেগী করিতে তখন ছালেক হাউস মহব্বত পাইতে থাকে। দুনিয়ার খারাপ কাজ সে তখন আর ভালবাসে না। এই হালাত ছালেক ও আশেকানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র হালাত। এই হালাত পীরে কামেলের সাহচর্যে, সাহায্যে, দয়া ও খেদমতের দ্বারাই লাভ হয়। তাই মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব বলিয়াছেন, তুমি যদি নাফস রূপ কাল সাপ হইতে বাঁচিতে চাও, তবে নাফস হন্তা মুর্শিদে কামেলকে শক্ত করিয়া ধর। অন্যথায় তোমাদের জীবনের সমস্ত বন্দেগী ধ্বংস হইয়া যাইবে। সারা জীবন বন্দেগী করিয়াও যদি শেষ নিঃশ্বাস আল্লাহতায়ালার ইয়াদের সহিত বাহির না হয়, খাতেমা বিল খায়ের না হয়, তাহা হইলে বেঈমান হইয়া মারা যাইতে হইবে।
বিজ্ঞাপন
মহা ওলী খাজাবাবা হযরত এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব এক মহান নেয়ামতের ডালা লইয়া দুনিয়াতে আসিয়াছিলেন ও সেই মহান নেয়ামতের ডালা তিনি রাখিয়া গিয়াছেন। সেই ডালা হইতে প্রতিদিন আল্লাহতায়ালার প্রেমের সুধার নেয়ামত ওয়াক্তে ওয়াক্তে তোমাদেরকে দান করা হইতেছে এবং আল্লাহতায়ালার প্রেমের সুধা পান করিয়া তোমরা অন্তরের শান্তি, ফয়েজ, রহমত ও বরকত লাভ করিতেছ। ইহা তামাম জাকেরদের জন্য এক অপূর্ব নেয়ামত।
হে জাকেরগণ! তোমরা সকলেই তরিকার কাজ ঠিক ঠিক মত কর। যথানিয়মে মুরাকাবা মুশাহেদা কর। পৃথিবী হইতে কখন চলিয়া যাইতে হইবে ঠিক নাই। রহমতের সময় দু'আ কবুলিয়াতের সময়। তখন নিবেদিত প্রাণে চোখের পানি লইয়া আল্লাহপাককে ডাক ও প্রতি লতিফাকে জিন্দা করিবার চেষ্টা কর।
চল্লিশ রকমের ফয়েজ আছে। উহাদের মধ্য হইতে এক এক রকম ফয়েজ আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে দেলে আসিয়া এক এক রকম জজবা বা ভাব সৃষ্টি করে। যখন কালব ও রূহ এক হয়, তখন ছালেক আল্লাহতায়ালার প্রেম সমুদ্রে সাঁতার কাটিতে থাকে। তখন আল্লাহর গুণে ছালেকের চরিত্র গঠন হইতে থাকে। তাই যিনি ভাগ্যগুণে কামেল পীর পাইলেন, আল্লাহকে পাওয়া তার জন্য সহজ হইল। সকলে তাই হর নিঃশ্বাসে আল্লাহকে স্মরণ কর ও আল্লাহপাকের জেকেরে কায়েম থাক।








