Logo

উচ্চ ফলনের চাপে নেত্রকোণায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশি ধানের জাত

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
নেত্রকোণা
১০ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৯
উচ্চ ফলনের চাপে নেত্রকোণায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশি ধানের জাত
ছবি: সংগৃহীত

নেত্রকোণায় স্থানীয় মানুষের খাদ্য চাহিদার তুলনায় ধানের উৎপাদন প্রায় আড়াই গুণ হলেও দিন দিন কমছে দেশি বা স্থানীয় জাতের ধানের আবাদ। অধিক ফলনের আশায় কৃষকেরা উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষে বেশি আগ্রহী হওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে একসময়ের জনপ্রিয় বহু দেশি জাত।

বিজ্ঞাপন

একসময় নেত্রকোণার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে চাষ হতো বিরই, নাতিশাইল, তুলসীমালা, কালোজিরা, টেপি ও জলকুমড়ীসহ নানা জাতের দেশি ধান। বর্তমানে এসব ধানের আবাদ অনেকটাই কমে এসেছে। কোনো কোনো জাতের চাষ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে।

কৃষকদের ভাষ্য, জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে খাদ্যের চাহিদাও বাড়ছে। একই জমিতে কম সময়ে বেশি ধান উৎপাদন করতে পারলে লাভ বেশি হয়। তাই স্বল্প জীবনকাল ও অধিক ফলনশীল জাতের প্রতি তাঁদের আগ্রহ বাড়ছে। একই শ্রম ও খরচে স্থানীয় জাতের তুলনায় বেশি ফলন পাওয়ায় কৃষকেরা উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাত বেছে নিচ্ছেন।

নেত্রকোণায় আমন ও বোরো—দুই মৌসুমেই ধানের আবাদ হয়। বর্তমানে উভয় মৌসুমেই উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধানের চাষ বেশি। কৃষকদের দাবি, স্থানীয় জাতের তুলনায় এসব জাতের ধানের ফলন অনেক বেশি। ফলে কম ফলন পাওয়া দেশি ধান চাষ করে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কৃষক মো. আবদুল হালিম বলেন, স্থানীয় জাতের ধানে পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হয়। তবে ফলন কম হওয়ায় কৃষকেরা এখন বেশি ফলনশীল জাতের দিকে ঝুঁকছেন। একই পরিশ্রমে বেশি ধান পাওয়া গেলে কৃষকেরা স্বাভাবিকভাবেই সেই জাত চাষে আগ্রহী হন।

স্থানীয় কৃষক ও প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় নেত্রকোণার বিভিন্ন অঞ্চলে দেশি জাতের ধানের ব্যাপক আবাদ ছিল। এসব ধানের ফলন তুলনামূলক কম হলেও স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষের কাছে ছিল বিশেষ জনপ্রিয়তা। স্থানীয় জাতের ধানের চালের বাজারমূল্যও অনেক সময় বেশি পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

চাল ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশি জাতের চালের চাহিদা এখনো রয়েছে। বিশেষ করে তুলসীমালা ও কালোজিরার চাল স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু কৃষকেরা এসব ধানের চাষ কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে সরবরাহও কমে গেছে। ফলে এসব চালের দাম তুলনামূলক বেশি।

স্থানীয় জাতের ধান সংরক্ষণ ও কৃষিবৈচিত্র্য রক্ষায় ২০০৫ সাল থেকে কাজ করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক। প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান বলেন, স্থানীয় জাতের ধান সংরক্ষণ এবং এসব জাতের আবাদ বাড়াতে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত ৫৩৩টি স্থানীয় জাতের ধান সংরক্ষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের দেশি জাতের ধান চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় জাতের ধান শুধু খাদ্যের উৎস নয়; এর সঙ্গে একটি এলাকার কৃষিব্যবস্থা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য জড়িত। এসব ধানের জাত হারিয়ে গেলে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও জৈববৈচিত্র্যের একটি অংশও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নেত্রকোণা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় জাতের ধানের উৎপাদন বাড়াতে গবেষণার পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের উচ্চ ফলনশীল জাতের পাশাপাশি স্থানীয় জাতের ধান চাষেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। কৃষিবৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় জাতের ধানের গুরুত্ব রয়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধানের উৎপাদন যেমন প্রয়োজন, তেমনি দেশি জাতের ধান সংরক্ষণ ও আবাদও জরুরি। কারণ এসব ধানের বাজারে চাহিদা থাকলেও উৎপাদন কমে গেলে একসময় অনেক পুরোনো জাত পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।

তাঁদের মতে, স্থানীয় জাতের ধানের চাষ বাড়াতে কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া, মানসম্মত বীজ সংরক্ষণ ও সহজলভ্য করা এবং উৎপাদিত ধানের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে উচ্চ ফলনশীল জাতের পাশাপাশি দেশি ধানের বৈচিত্র্যও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD