Logo

মজা সুপারির দর অর্ধেক, লোকসানের শঙ্কায় লালমনিরহাটের কৃষক

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
লালমনিরহাট
৮ আগস্ট, ২০২৬, ১৭:৪৩
মজা সুপারির দর অর্ধেক, লোকসানের শঙ্কায় লালমনিরহাটের কৃষক
ছবি: প্রতিনিধি

মৌসুমের শুরুতে ভালো দামের আশায় সুপারি কিনে পানির নিচে সংরক্ষণ করেছিলেন লালমনিরহাটের কৃষকরা। কয়েক মাস পর সেই সুপারি বাজারে তুললেও মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। গত বছরের তুলনায় এবার পানিতে সংরক্ষিত ‘মজা সুপারি’র মূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে উৎপাদন, সংরক্ষণ, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ তুলতে না পেরে লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

বিজ্ঞাপন

লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, গত বছরের তুলনায় এবার সুপারির বাজার অনেকটাই দুর্বল। প্রায় অর্ধেক দামে সুপারি বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে সংরক্ষণ ও শ্রমিকের পেছনে যে ব্যয় হয়েছে, সেটিও উঠছে না। উৎপাদিত সুপারি বাজারজাত করতে কৃষকদের আরও কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরাও একই অভিযোগ করেছেন। আদিতমারী, কালীগঞ্জ, সদর, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রামের বিভিন্ন বাজারে সংরক্ষিত সুপারি নিয়ে আসা কৃষকদের মধ্যে কম দাম নিয়ে হতাশা দেখা গেছে। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় সুপারি সংরক্ষণ করার পর যদি উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয়ই উঠে না আসে, তাহলে পানির নিচে সুপারি সংরক্ষণ করে লাভবান হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বড়বাড়ী হাটের ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর এ সময়ে দেশি মজা সুপারি প্রতি পোনে (৮০টি) ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। চলতি মৌসুমে একই পরিমাণ সুপারি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায়। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ—দুই ক্ষেত্রেই দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিজ্ঞাপন

একইভাবে প্রতি কাউন (১৬ পোন) সুপারি গত বছর ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৯ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও এবার তা নেমে এসেছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টাকায়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কৃষকরা জানান, সুপারি উৎপাদনের পর দীর্ঘ সময় ভালো রাখতে তা পানির নিচে সংরক্ষণ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের মজুরি, সুপারি ওঠানো-নামানো, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে বাজারদর কমে গেলে শুধু বিক্রয়মূল্যই কমে না, সংরক্ষণে করা বাড়তি বিনিয়োগও কৃষকের জন্য লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত মৌসুমের শেষ দিকে সংরক্ষিত সুপারি বাজারে তুললে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার আশা করেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তবে এবার বাজারে একই সময়ে বিপুল পরিমাণ সংরক্ষিত সুপারি ওঠায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। সরবরাহ বেশি থাকায় পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করার ক্ষেত্রেও কৃষকরা সুবিধা করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তারা।

লালমনিরহাটের সুপারি বাজারে কৃষকদের পাশাপাশি মৌসুমি সংরক্ষণকারী ব্যবসায়ীরাও সুপারি মজুত করেন। ব্যবসায়ী মোস্তফা হোসেন বলেন, মৌসুমের শুরুতে কৃষকদের কাছ থেকে সুপারি কিনে পানির নিচে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যে দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তাতে ক্রয়মূল্যই ফেরত পাওয়া কঠিন। এর সঙ্গে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় যুক্ত হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মহাজন ফজলুর রহমান বলেন, মৌসুমের শেষ দিকে সাধারণত সংরক্ষিত সুপারির চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এবার বাজারে সরবরাহ তুলনামূলক বেশি থাকায় প্রত্যাশিত চাহিদা তৈরি হয়নি। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত মজুত সুপারি বিক্রি করতে গিয়ে কম দাম পাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন জানান, লালমনিরহাটের গ্রামাঞ্চলের বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক পরিমাণ সুপারি গাছ রয়েছে। এর পাশাপাশি জেলায় প্রায় ৫১৪ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে সুপারি চাষ হচ্ছে। উৎপাদন, বাজারে সরবরাহ এবং চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই সাধারণত সুপারির দাম নির্ধারিত হয়।

তবে বর্তমান বাজারদর ও কৃষকদের বাজারজাতকরণ পরিস্থিতি সম্পর্কে জেলা কৃষি বিপণন দপ্তরের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, মজা সুপারির বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

কৃষকদের দাবি, শুধু সুপারি উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিলেই হবে না; উৎপাদিত সুপারি সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে মৌসুম শেষে বাজারে একসঙ্গে অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমানো, বিকল্প বাজার সৃষ্টি এবং কৃষকদের আগাম বাজারদরের তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

কৃষকরা বলছেন, সুপারি তাঁদের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস। কিন্তু বাজারদর পড়ে গেলে উৎপাদন ও সংরক্ষণে করা বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়ে। বর্তমান দরপতন দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী মৌসুমে সুপারি উৎপাদন ও পানির নিচে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD