দেশে চাষে সহজলভ্য বিদেশি ফল, বাড়ছে কৃষক-ক্রেতার আগ্রহ

এক সময় দেশের বাজারে ড্রাগন, স্ট্রবেরি, রামবুটান কিংবা অ্যাভোকাডোর মতো বিদেশি ফল ছিল বেশ দুর্লভ। পাওয়া গেলেও উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকত এসব ফল। তবে গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে এসব ফলের চাষ শুরু হওয়ায় এখন রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যায়ের বাজারেও সহজেই মিলছে বিদেশি জাতের নানা ফল। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কমেছে দাম, বেড়েছে ভোক্তাদের আগ্রহও।
বিজ্ঞাপন
শুধু ড্রাগন বা স্ট্রবেরিই নয়, বর্তমানে বিদেশি জাতের আম, বারোমাসি ভিয়েতনামি আঠামুক্ত কাঁঠাল, থাই পেয়ারা, লংগান ও অ্যাভোকাডোর মতো ফলও ধীরে ধীরে দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ুর অনুকূল পরিবেশ এবং কৃষকদের আগ্রহের কারণে নতুন জাতের ফলের উৎপাদন ও চাহিদা—দুটিই দ্রুত বাড়ছে।
ফল বিশেষজ্ঞ ও বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, করোনা মহামারির সময় মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়ে যাওয়ায় ফল খাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই সময় থেকেই পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ নতুন ধরনের ফলের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে, যা বিদেশি ফলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিজ্ঞাপন
তার মতে, বাংলাদেশের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া বিশ্বের অনেক বিদেশি ফল চাষের জন্য উপযোগী। ইতোমধ্যে ড্রাগন, রামবুটান, অ্যাভোকাডো ও স্ট্রবেরির মতো ফল সফলভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন জাতের ফল দেশের কৃষিতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক ড. সুরজিৎ সরকারের মতে, বিদেশি ফল জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এসব ফল দেখতে আকর্ষণীয় এবং বাজারমূল্য ভালো হওয়ায় কৃষকেরা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। অনেক বিদেশি জাতের ফল বছরের অধিকাংশ সময় পাওয়া যায়, ফলে বাজারে এর চাহিদাও স্থিতিশীল থাকে। এছাড়া তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও এসব ফল বিক্রিতে আগ্রহী হচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, দেশের ফলের মৌসুম মূলত মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। বছরের বাকি সময়ে পুষ্টির চাহিদা পূরণে বিদেশি ফলের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। তবে গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় ফলের উৎপাদনকাল দীর্ঘায়িত করা এবং সারা বছর সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, মানসম্মত উৎপাদন ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় ফলের রপ্তানির সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বর্তমানে দেশে উৎপাদিত বিদেশি ফলের মধ্যে ড্রাগন, স্ট্রবেরি, রামবুটান, থাই পেয়ারা, লংগান ও অ্যাভোকাডো উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি বিদেশি জাতের কাটিমন, গৌড়মতি, ইলামতি, ব্যানানা ম্যাংগো, কিং অব চাকাপাত, কিং অব চিয়াংমাই, আমেরিকান পালমার, কিউজাই, মিয়াজাকি, তাইওয়ান গ্রিন, ব্রুনাই কিং ও নামডকমাই জাতের আমের চাষও বাড়ছে। এছাড়া বারোমাসি ভিয়েতনামি আঠামুক্ত কাঁঠালও কৃষকদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
দেশে বিদেশি ফলের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে ড্রাগনের। ২০০৪-০৫ সালের দিকে দেশে প্রথম এ ফলের চাষ শুরু হয়। পরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে প্রদর্শনী বাগান স্থাপন করে এর চাষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৯৫ হেক্টর জমিতে ৮ হাজার ৬৯৫ টন ড্রাগন উৎপাদিত হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৮ হাজার ৭৪৯ টনে পৌঁছেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ড্রাগনের উৎপাদন এক লাখ টন স্পর্শ করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
কুড়িগ্রামের সফল চাষি খোরশেদ আলম জানান, ড্রাগন দীর্ঘমেয়াদি ও লাভজনক একটি ফসল। শুরুতে কিছুটা বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও পরবর্তীতে পরিচর্যার খরচ কম। সামান্য যত্নেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
ড. মেহেদী মাসুদের মতে, ড্রাগনের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর উচ্চ পুষ্টিমান, দীর্ঘদিন সংরক্ষণের সুবিধা এবং সরকারি পর্যায়ের সম্প্রসারণ কর্মসূচি। পরিকল্পিতভাবে প্রায় আট হাজার প্রদর্শনী বাগান স্থাপন করায় খুব অল্প সময়েই এ ফল দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপেও ড্রাগন রপ্তানি শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে স্ট্রবেরির উৎপাদন কয়েক বছর বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭৯ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৬৩৫ টন স্ট্রবেরি উৎপাদন হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৭০০ টনে নেমেছে।
জয়পুরহাটের কৃষক আলী আকবর প্রায় আট বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে স্ট্রবেরি চাষ করছেন। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় হলেও ভালো ফলন হলে বিক্রি থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
তবে স্ট্রবেরির বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া। সংগ্রহের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজারজাত করতে না পারলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই এ ফলের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উন্নয়ন জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
বিদেশি জাতের আমের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে কাটিমন। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বছরে একাধিকবার ফল দেওয়ার সক্ষমতা থাকায় এই জাতের আম দ্রুত কৃষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। মৌসুমে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হলেও শীতকালে প্রতি কেজির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
একইভাবে বারোমাসি ভিয়েতনামি আঠামুক্ত কাঁঠালের চাষও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার কলম বিতরণ করা হয়েছে। এসব গাছ থেকেই এখন বিভিন্ন নার্সারিতে নতুন কলম তৈরি করে চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
ড. মেহেদী মাসুদের মতে, সারা বছর কাঁঠাল উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানিযোগ্য ফলে পরিণত হবে। পাশাপাশি আনারসও ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের এক ক্রেতা শাহীন জানান, বর্তমানে ড্রাগন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। তার সন্তানরা নিয়মিত ড্রাগন ও স্ট্রবেরি খায়। একসময় বিদেশি হিসেবে পরিচিত এসব ফল এখন অনেকটাই দেশের পরিচিত ফলের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন জাতের ফলের সম্প্রসারণ, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটানো গেলে দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ফল রপ্তানির সুযোগও আরও বিস্তৃত হবে।








