Logo

ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় কাপাসিয়ার লিচু চাষিরা

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
কাপাসিয়া, গাজীপুর
১৬ মে, ২০২৬, ২০:৩১
ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় কাপাসিয়ার লিচু চাষিরা
ছবি প্রতিনিধি।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাণীগঞ্জ এখন যেন লিচুর এক প্রাণচঞ্চল জনপদ। সকাল গড়াতেই বাজারজুড়ে ভিড় জমাচ্ছেন পাইকার, খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতারা। লাল-সবুজ রঙের থোকায় থোকায় ঝুলে কা লিচু আর সড়কের দুই পাশে সাজানো বাঁশের ঝুড়ি জানান দিচ্ছে কাপাসিয়ায় শুরু হয়েছে মৌসুমি লিচুর জমজমাট বেচাকেনা। তবে উৎসবমুখর এই বাজারের আড়ালে অনাবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন চাষিরা।

বিজ্ঞাপন

উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জকে ঘিরে বড়চালা, নাজাই, মেরুন, দড়িমেরুন, রাওনাট, পানবড়াইদ, বাড়ৈগাঁও, ঘোষাইরগাঁও ও ফুলবাড়িয়াসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে উৎপাদিত লিচুই মূলত এই বাজারে আসে। সুস্বাদু ও রসালো হওয়ায় কাপাসিয়ার লিচুর কদর রয়েছে দেশজুড়ে। তাই নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা ছুটে আসছেন রাণীগঞ্জ বাজারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সিএনজি, পিকআপ ও ৪-৫টি ট্রাকভর্তি লিচু দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি লিচু যাচ্ছে নরসিংদী জেলায়। এছাড়া ঢাকাসহ আশপাশের বড় বাজারগুলোতেও পৌঁছে যাচ্ছে কাপাসিয়ার বিখ্যাত লিচু।

বিজ্ঞাপন

রাণীগঞ্জ বাজারে বর্তমানে দেশি, বোম্বাই, চায়না-৩, বাড়ি-৩, বেলারি ও কালিপুরী জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে। আকার ও মানভেদে প্রতি হাজার লিচুর দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। খুচরা বাজারে প্রতিটি লিচু বিক্রি হচ্ছে ১ থেকে ৫ টাকা দরে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত চলছে লিচু সংগ্রহ, গণনা ও বাজারজাতকরণের ব্যস্ততা। গাছের নিচে শ্রমিকরা পাকা লিচু নামাচ্ছেন, কেউ পাতার বিছানায় সাজাচ্ছেন, আবার কেউ ট্রাকে তুলছেন। বাজারের দুই পাশে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষ লিচু বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেক গাড়িচালক ও ক্রেতা সরাসরি বাগান থেকেই লিচু কিনে নিচ্ছেন।

রাণীগঞ্জ বাজারের ইজারাদার মো. গিয়াস উদ্দিন ফকির জানান, প্রতি হাজার লিচুতে ৮০ টাকা খাজনা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার লিচু বিক্রি হয়। এবার ফলন কম হলেও লিচুর গুণগতমান ভালো। নষ্টও কম হচ্ছে। তবে ৯ লাখ ১০ হাজার টাকায় বাজার ইজারা নিয়েছি, টাকা উঠানো নিয়ে চিন্তায় আছি।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় ব্যবসায়ী সাহাব উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন প্রায় শতাধিক পাইকার এখানে আসেন। লিচু ২৫শ থেকে ৩৫শ টাকা হাজারে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এবার ফলন কম।

বাড়ৈগাঁও গ্রামের কৃষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসলাম জানান, প্রায় ২০ শতাংশ জমিতে ৫০টি লিচুগাছ রয়েছে তাঁর। গত ১০ বছর ধরে তিনি বাণিজ্যিকভাবে লিচু বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, “এবার ফলন তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার লিচু বিক্রি হতে পারে।

ঘোষাইরগাঁও গ্রামের নয়ন দাস বলেন, আমি ৩ থেকে ৪ হাজার লিচু বিক্রি করি। জাতভেদে ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যায়। বাজারে এখন দেশি, বেলারি, বোম্বাই ও চায়না-৩ লিচু উঠছে।

বিজ্ঞাপন

কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুর থেকে আসা পাইকার শাহ আলম বলেন, “কাপাসিয়ার লিচুর মান অনেক ভালো, খেতেও খুব মিষ্টি। এখান থেকে লিচু কিনে বিক্রি করে আমরা লাভবান হই।”

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে আসা ব্যবসায়ী রোমান বলেন, প্রতিবছর কাপাসিয়া থেকে লিচু কিনি। তবে এবার ফলন কম হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় চাষিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়া ও টানা তাপপ্রবাহের কারণে লিচুর গুটি ঝরে পড়ছে। অনেক বাগানে কাঙ্ক্ষিত আকারে লিচু বড় হয়নি। নিয়মিত সেচ ও ওষুধ প্রয়োগ করেও আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না তারা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কাপাসিয়ায় প্রায় ৩২৭ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন। উপজেলার বহু পরিবার বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষের ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয়দের মতে, লিচু কাপাসিয়ার মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবছরের মতো এবারও লিচুকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও অনাবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের কারণে চাষিদের মুখে এখন স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD