শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা : বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে বদলি

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে পাশবিক নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার মামলাটি এখন বিচারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালত গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে মামলাটি আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আজ রবিবার (২৪ মে) দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এই চার্জশিট দাখিল করেন। এরপর শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত চার্জশিটটি আমলে নেন এবং মামলাটি বিচারের জন্য বদলির আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী আইনি কার্যক্রম ও বিচার প্রক্রিয়া এখন থেকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে অনুষ্ঠিত হবে।
বিজ্ঞাপন
মামলার নথি ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে নিজের ঘর থেকে বাইরে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে ফুসলিয়ে নিজেদের ঘরে নিয়ে যায়। এর ঘণ্টাখানেক পর, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
কোথাও তাকে না পেয়ে একপর্যায়ে অভিযুক্তদের ঘরের দরজার সামনে রামিসার জুতা পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। সন্দেহ হওয়ায় দরজায় বারবার ধাক্কা ও ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। পরে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। শয়নকক্ষে ঢুকেই মেঝেতে রামিসার মস্তকহীন দেহ এবং ঘরের ভেতরের একটি বড় বালতিতে তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান তারা।
এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে মূল অভিযুক্তের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার পরপরই প্রধান ঘাতক সোহেল রানা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
বিজ্ঞাপন
পরবর্তীতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে ঘাতক সোহেলকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এই নির্মম ঘটনায় পরের দিন বুধবার (২০ মে) শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
গ্রেপ্তারের পরদিনই (বুধবার) আদালতে হাজির করা হলে বিচারকের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করে অত্যন্ত নৃশংস ও রোমহর্ষক জবানবন্দি দেয় ঘাতক সোহেল রানা। মাদকাসক্ত এই খুনি জানায়, হত্যাকাণ্ডের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সে ইয়াবা সেবন করে বিকৃত মানসিকতার শিকার হয়েছিল।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৯ মে সকালে রামিসা ঘর থেকে বের হওয়ামাত্রই সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে টেনে নিজেদের ঘরের ভেতর নিয়ে আসে। এরপর সোহেল শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। তীব্র যন্ত্রণায় ও পাশবিকতায় শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ঠিক ওই সময়েই রামিসার মা নিখোঁজ মেয়ের খোঁজে তাদের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেন। দরজার আওয়াজ শুনে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহেল বাথরুমে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার গলা কেটে ফেলে।
বিজ্ঞাপন
মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে সে রামিসার মাথা কেটে শরীর থেকে পুরোপুরি আলাদা করে বালতিতে লুকিয়ে রাখে। এমনকি দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং ধারালো ছুরি দিয়ে শিশুটির যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। এরপর বাথরুম থেকে রক্তাক্ত দেহটি এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে।
জবানবন্দিতে সোহেল স্পষ্ট জানায়, অবুঝ শিশুটিকে বলির পাঁঠা বানানোর পুরো সময়টাতে তার স্ত্রী স্বপ্না একই ঘরে উপস্থিত ছিল এবং তাকে সহযোগিতা করেছিল। লাশ ঘরের ভেতর রেখেই সোহেল জানালার গ্রিল কেটে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
মাদক সেবন করে এই বিকৃত ও বর্বর কর্মকাণ্ড ঘটানো ঘাতক সোহেল আদালতকে আরও জানায়, রামিসার পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বিরোধ ছিল না। কেবল মাদকের উন্মাদনা আর পাশবিক লালসার শিকার হতে হয়েছে আট বছরের নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে।








