Logo

যাত্রাবাড়ী হত্যা মামলায় আসামী ঢামেক পরিচালক, কাউকেই চেনেন না বাদী

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৯:৩৫
যাত্রাবাড়ী হত্যা মামলায় আসামী ঢামেক পরিচালক, কাউকেই চেনেন না বাদী
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় করা জুলাই হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামানকে। তবে মামলার বাদী মিরাজ হোসেন জানিয়েছেন, এ মামলায় নাম থাকা কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।

বিজ্ঞাপন

বাদীর দাবি, আইনজীবীর আগ্রহেই বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলাটি করা হয়েছে। এমনকি মামলার আইনজীবীর নামও তিনি সঠিকভাবে বলতে পারেননি।

মামলাটি দায়ের করা হয় গত বছরের ১৮ মার্চ। সম্প্রতি মামলায় ঢামেক পরিচালকের নাম থাকার বিষয়টি সামনে এলে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এফআইআরে ৮০০-৯০০ আসামি

বিজ্ঞাপন

মামলার নথি অনুযায়ী, মিরাজ হোসেন নামের এক শ্রমিক যাত্রাবাড়ী থানায় মামলাটি করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ৩০৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে।

সব মিলিয়ে মামলায় আসামির সংখ্যা ৮০০ থেকে ৯০০ জন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এফআইআরে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ী মোড়ে ছাত্র-জনতার ওপর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হামলা চালান। আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে বেআইনি জনতা গঠন, দাঙ্গা, হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত, প্ররোচনা এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে মামলার এজাহারে আলাদাভাবে কোনো আসামি কী ধরনের অপরাধে জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বর্ণনা নেই।

বিজ্ঞাপন

১০২ নম্বর আসামি ঢামেক পরিচালক

মামলার ১০২ নম্বর আসামি হিসেবে ডা. মো. আসাদুজ্জামানের নাম রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা হলেও এফআইআরে তাকে মেজর জেনারেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বাদী মিরাজ হোসেন পেশায় শ্রমিক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি মতিঝিলে ফুটপাতে কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন। আন্দোলনের সময় মাথা, হাত ও কোমরে আঘাত পান। মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে অন্তত ১৪টি সেলাই দিতে হয়েছিল বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে আর্থিক ও শারীরিক সংকটের কারণে ঢাকায় না থেকে মুন্সীগঞ্জে অবস্থান করছেন মিরাজ।

‘উকিলে সাইন নিছে, পরে মামলা করছে’

মামলার আসামিদের কাউকে না চেনার কথা জানিয়ে মিরাজ বলেন, এত বড় মামলা করার বিষয়ে তার নিজের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আইনজীবী তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে পরে মামলা করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

মিরাজের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলায় এত বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে—এমন বিষয়ও তিনি পরে জানতে পারেন।

তিনি বলেন, যাদের তিনি চেনেন না, তাদের বিরুদ্ধে নিজে থেকে মামলা করার কোনো কারণও তার ছিল না।

মামলাটিকে কেন্দ্র করে নিজের অজান্তে অন্যরা সুবিধা নিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, মামলাটিকে ব্যবহার করে এক ধরনের বাণিজ্য করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাদীর বলা আইনজীবীর নামও মেলেনি

মিরাজ মামলার আইনজীবী হিসেবে ‘রুবেল’ নামের একজনের কথা উল্লেখ করেন। তার দেওয়া একটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে অ্যাডভোকেট রুবেল জানান, তিনি মামলাটির আইনজীবী নন।

তবে কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি মিরাজকে চিনতে পারেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মিরাজ গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলেও জানান।

বিজ্ঞাপন

মামলার নথিপত্রে অবশ্য আইনজীবী হিসেবে অ্যাডভোকেট এসএম ইসমাইল হোসেনের নাম রয়েছে।

এসএম ইসমাইল হোসেন বলেন, মামলার আসামিদের বিষয়ে তিনি আলাদাভাবে বলতে পারবেন না। বাদী যেসব নাম দিয়েছেন, সেভাবেই মামলা করা হয়েছে।

তার দাবি, তিনি বাদীকে নামগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন এবং আরজি পড়ে দেখেছেন কি না, সেটিও জানতে চেয়েছিলেন। বাদী সবকিছু ঠিক আছে বলে নিশ্চিত করার পর আইনগত দায়িত্ব অনুযায়ী তিনি কাজ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু এবং মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. নাজমুল হাসানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জুলাই আন্দোলনে পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে চিকিৎসকদের ভিন্ন দাবি

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে ডা. মো. আসাদুজ্জামানকে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর নিয়োগ দেওয়া হয়। পরের বছরের ৪ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকদের কয়েকজনের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঢামেকের পরিচালক পদে থাকলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাঁর কোনো বিতর্কিত ভূমিকা তারা দেখেননি। বরং আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় তিনি সহযোগিতা করেছেন।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক গুলিবিদ্ধ রোগী হাসপাতালে আসার পর সব সার্জারি বিভাগকে গানশট রোগীদের চিকিৎসার জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন পরিচালক। আহতদের রক্তের চাহিদা মেটাতে চিকিৎসকদের উদ্যোগে অস্থায়ী ব্লাড ক্যাম্প গঠনেও তিনি সহযোগিতা করেন।

এ ছাড়া ৩ আগস্ট দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অংশ শেখ হাসিনার পক্ষে ‘শান্তি সমাবেশ’ আয়োজন করলেও ঢামেক পরিচালক এতে অংশ নেননি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, জুলাই আন্দোলনে চিকিৎসাসেবায় পরিচালকের অবদান ছিল এবং ৫ আগস্টের পরও তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ওই চিকিৎসক।

ড্যাব নেতারাও জানালেন অভিযোগ শোনেননি

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ডা. মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ৫ আগস্টের পর তিনি ঢামেকে যোগ দিয়েছেন। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পরিচালকের কোনো বিরূপ ভূমিকার অভিযোগ তিনি শোনেননি।

অভিযোগ গুরুতর হলে বিষয়টি পর্যালোচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

ড্যাবের ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি ডা. রেজোয়ানুর রহমান সোহেল মামলায় পরিচালকের নাম দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাঁর প্রশ্ন, ঢামেকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একজন ব্যক্তি কীভাবে হাসপাতাল থেকে যাত্রাবাড়ীতে গিয়ে হামলায় অংশ নেবেন।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিয়ে গঠিত বিশেষ সেলের কার্যক্রমেও পরিচালক নিয়মিত যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সভায় রাত পর্যন্ত তিনি উপস্থিত থেকে আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

পরিচালকের অভিযোগ, টেন্ডার বাণিজ্য বন্ধ করায় টার্গেট

নিজের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছেন—হাসপাতালে তখন কর্মরত সবাই বিষয়টি জানেন।

তিনি অভিযোগ করেন, টেন্ডারবাজি করতে না পারায় একটি পক্ষ তাঁর সম্মানহানি করার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার কারণেই তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

এর আগে গত ১১ আগস্ট চিকিৎসকদের একটি অংশ ঢামেক পরিচালকের কক্ষে তাঁকে অবরুদ্ধ করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে এ নিয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। স্বাস্থ্য সচিবের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

ওই ঘটনায় ড্যাবের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মুহাম্মদ জাবেদ আহমেদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেন। ডা. জাবেদ অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন।

ফলে যাত্রাবাড়ীর হত্যা মামলায় ঢামেক পরিচালকের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিয়ে একদিকে বাদীর বক্তব্য ও মামলার নথির মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে তাঁর জুলাই আন্দোলনকালীন ভূমিকা নিয়েও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। মামলার তদন্তে এসব অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কতটা প্রমাণিত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD