Logo

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সরকার-বিরোধী দল ব্যর্থ: তাজুল ইসলাম

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:০৫
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সরকার-বিরোধী দল ব্যর্থ: তাজুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া জনআকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণে সরকার ও বিরোধী দল—উভয়েই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় জাতীয় ঐক্যের মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মঞ্চ ২৪ আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অনৈক্য ও বাংলাদেশের ক্ষতি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

তাজুল ইসলাম বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অভূতপূর্বভাবে একত্রিত হয়েছিলেন। বিচারক, সচিব, পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, রিকশাশ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অংশ নেন। অনেকে পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের নিয়েও রাজপথে নেমেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, হেলিকপ্টার ও এপিসি থেকে গুলি ছোড়ার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে দেশে যে জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে অনৈক্যের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে মূল বিভাজন তৈরি হচ্ছে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রশ্নে।

তার মতে, মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা পরিচালিত হবে না। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিপীড়ন, হত্যাকাণ্ড কিংবা হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের কাজে ব্যবহার করা হবে না। নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হবে না এবং রাষ্ট্র দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে সুশাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

‘জুলাই চার্টার’ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই এটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মত হয়ে স্বাক্ষর করেছে। এখন মূল মতপার্থক্য বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে। তবে জনগণ কোন পদ্ধতিতে এটি বাস্তবায়ন হবে, সেটিকে প্রধান বিষয় মনে করে না। তারা জুলাই চার্টার নিয়ে গণভোটে দেওয়া রায়ের বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন হবে নাকি সংস্কারের মাধ্যমে—এটি জনগণের কাছে মুখ্য নয়। তারা দেখতে চায়, সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে জনগণের বিভিন্ন সমস্যা ও ইস্যু নিয়ে কথা বলছেন, সংসদ কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এসেছে। এসব প্রত্যাশা পূরণ না হলে জাতীয় ঐক্যের বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ বা অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারের ধারণা সামনে রেখে কাজ করা প্রয়োজন। গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এ প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এসব বিচার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং অল্প কিছু রায় হয়েছে। তাই বিচার দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, প্রধান অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে কোনো সমাজে প্রকৃত স্বস্তি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে কারা এবং কীভাবে জড়িত ছিল, কোন বাহিনী বা প্রতিষ্ঠান এতে ভূমিকা রেখেছিল—এসব তথ্য যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব তথ্য সংরক্ষণ ও গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পরও কাঙ্ক্ষিত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাজুল ইসলাম বলেন, যারা ট্যাংক, এপিসি ও হেলিকপ্টারের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন, তারা যদি দেখেন তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার হচ্ছে না, তাহলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সেই ক্ষোভ বাড়তে থাকলে রাষ্ট্রে আবারও আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না এবং বিভিন্ন সমস্যার যথাযথ সমাধান ও মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, যারা সংসদে গেছেন, তারা জুলাইয়ের মতো একটি বড় গণঅভ্যুত্থান কোন প্রেক্ষাপটে এবং কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংসদে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক বিরোধিতা করা এবং বিকল্প পথ তুলে ধরার দায়িত্ব বিরোধী দলের সদস্যরা যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। ফলে জুলাইয়ের পর গঠিত সংসদে সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষই বাংলাদেশের মানুষের গণআকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাইয়ে প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছরের গুম, নিখোঁজ, মামলা ও কারাবরণের মতো নানা ঘটনার ইতিহাস। এসব ত্যাগ ও আত্মত্যাগের বিষয় মাথায় রেখে সরকার ও বিরোধী দল—উভয়কেই জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। অন্যথায় তাদের জন্যও কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করতে পারে।

জুলাইয়ের শহীদ ও নিখোঁজদের পরিবারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সন্তান হারানো পরিবারের বেদনা এবং গুম হয়ে যাওয়া স্বজনের অপেক্ষায় থাকা মানুষের কষ্ট ভুলে গেলে রাষ্ট্র তার পথ হারাবে। তাই জুলাইয়ের শহীদদের স্বপ্ন ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

বিজ্ঞাপন

মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সংগঠনটির উপদেষ্টা ডিউক হুদা, ড. ফয়জুল হক, লে. কর্নেল ফেরদৌস আজিজ ও শেখ মহিউদ্দিন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD