দুই বছর পরও অপেক্ষায় বিচারহীন ভোলার ১৩ শহীদের পরিবার

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকায় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় ভোলা জেলার ১৩ জন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে এবং একজন পদদলিত হয়ে মারা যান।
বিজ্ঞাপন
কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, হোটেল কর্মচারী ও বিভিন্ন পেশার এসব তরুণ-যুবক জীবিকার সন্ধানে রাজধানীতে গিয়ে আর পরিবারের কাছে জীবিত ফিরতে পারেননি। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তাদের ক্ষোভ ও বেদনা আরও গভীর হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরের তথ্য, স্বাস্থ্য বিভাগের নথি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রণীত তালিকা অনুযায়ী, ওই দিন নিহত ১৩ জনের সবাই ভোলা জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, আন্দোলনের একদিনে অন্য কোনো জেলা থেকে এত বেশি মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নিহতদের মধ্যে ছিলেন ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের ড্রাইভার বাবুল (৪০), বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড় মানিকা ইউনিয়নের ভোলা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নাহিদ (২১), দেউলা ইউনিয়নের রাজমিস্ত্রী ইয়াছিন (২৩) এবং একই ইউনিয়নের রিকশাচালক জামাল উদ্দিন (৩৫), যিনি পদদলিত হয়ে মারা যান।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া লালমোহন উপজেলার হোটেল কর্মচারী আরিফ (১৭), লন্ড্রি দোকানি মোছলেহ উদ্দিন (৩৫), রিকশাচালক আক্তার হোসেন (৩৫), মুফতি শিহাবউদ্দিন (৩০), মিষ্টির দোকানের কর্মচারী শাকিল (২০) ও হোটেল কর্মচারী সাইদুল (১৪) নিহতদের তালিকায় রয়েছেন।
চরফ্যাশন উপজেলার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের বেকারি কর্মী সোহাগ (১৭), রসুলপুর ইউনিয়নের রাজমিস্ত্রী বাহাদুর হোসেন মনির (১৮) এবং দুলারহাট এলাকার ট্রাকচালক মো. হোসেন (২৫)ও ওই দিনের প্রাণহানির শিকার হন।
১৯ জুলাই তাদের পরিবারের কাছে আজও শোকের দিন। নিহতদের স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর এদিন মিলাদ, দোয়া ও কোরআনখানির আয়োজন করে তারা প্রিয়জনদের স্মরণ করেন। তবে সময়ের সঙ্গে ক্ষত শুকায়নি; বরং বিচার না পাওয়ার হতাশা আরও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
লালমোহন উপজেলার শহীদ আরিফের পরিবার এখনও আর্থিক ও মানসিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র ছেলে আরিফ স্থানীয় একটি মাদরাসায় আলিম শ্রেণিতে পড়তেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অস্থায়ীভাবে ঢাকায় একটি দোকানে কাজ করতে গিয়েছিলেন। আন্দোলনের দিন বাইরে বের হওয়ার পর গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়।
আরিফের বাবা ইউসুফ বলেন, ছেলেকে ঘিরেই ছিল পরিবারের সব স্বপ্ন। বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। সরকারি ভাতা পেলেও তা দিয়ে সংসার ও মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যয় মেটানো কঠিন। তার একমাত্র দাবি, ছেলের হত্যার বিচার নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে ভোলা সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী নাহিদের বাবা জলিল মাতুব্বর বলেন, একমাত্র সন্তানকে হারানোর শোক কখনও কাটবে না। প্রতি মুহূর্তে ছেলের কথা মনে পড়ে। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের সদস্যরা দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করেছেন।
বিজ্ঞাপন
শুধু আরিফ বা নাহিদের পরিবার নয়, অন্য শহীদদের স্বজনরাও একই ধরনের কষ্টের কথা জানিয়েছেন। কেউ আগেই দোয়া মাহফিল করেছেন, আবার কেউ ১৯ জুলাই উপলক্ষে নিজ নিজ এলাকায় মিলাদের আয়োজন করেছেন।
শহীদ পরিবারের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, যেসব স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়ে তাদের স্বজনরা প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই বৈষম্যহীন সমাজ এখনো গড়ে ওঠেনি। তাদের মতে, মাসিক সরকারি ভাতা কিছুটা সহায়তা করলেও অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক সংকট কাটেনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ভোলার শহীদ পরিবারগুলোর প্রতিনিধি রাসেল হোসেন রাফি বলেন, অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানোর পর জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি সহায়তা থাকলেও বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে হত্যা মামলাগুলোর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবিও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। কিন্তু তাদের প্রত্যাশার অনেক কিছুই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা রয়েছে।
অন্যদিকে ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ সংগঠনের ভোলা জেলা শাখার সদস্যসচিব মো. রাকিব বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের মধ্যে ভোলার বহু মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিনের সহিংসতায় ভোলার ১৩ জন প্রাণ হারান এবং আরও অনেকে আহত হন।
দুই বছর পরও ভোলার এসব পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা একটাই—প্রিয়জনদের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিচার এবং তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।








