Logo

‘পানি লাগবে পানি’ ডাকে অমর মুগ্ধ, এখনো অধরা বিচার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩৩
‘পানি লাগবে পানি’ ডাকে অমর মুগ্ধ, এখনো অধরা বিচার
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে রাজধানী ঢাকা ছিল সংঘাত, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। আন্দোলনকারীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ঠিক সেই সময় নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে তৃষ্ণার্ত মানুষদের হাতে পানি ও বিস্কুট তুলে দিতে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন এক তরুণ। তার কণ্ঠে বারবার ভেসে আসছিল মানবিক আহ্বান— ‘পানি লাগবে পানি।’ মুহূর্ত পরই গুলিবিদ্ধ হয়ে থেমে যায় সেই কণ্ঠ।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এমবিএ শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ আজ শুধু একটি নাম নয়; তিনি মানবিকতা, সাহস এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। তবে তার মৃত্যুর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ হয়নি। এতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে তার পরিবার।

উত্তাল দিনের মানবিক মুখ

১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরা আজমপুর এলাকায় আন্দোলনের উত্তেজনার মধ্যেও মুগ্ধকে দেখা যায় হাতে পানির বোতল ও বিস্কুট নিয়ে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়াতে। কেউ আহত, কেউ ক্লান্ত, কেউ তৃষ্ণার্ত—সবাইকে সাহায্য করার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তার বন্ধু নাইমুর রহমান আশিক জানান, পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে সবাই যখন নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখেন মুগ্ধ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। তখনও তার হাতে ছিল পানি ও বিস্কুটভর্তি পলিথিন।

অন্য বন্ধু জাকিরুল ইসলাম জানান, গুলিটি মুগ্ধের কপালে আঘাত করে ডান কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আহত অবস্থায়ও তার পাশে পড়ে ছিল পানির বোতলের কেস। দ্রুত তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, কোটি মানুষের স্মৃতি

বিজ্ঞাপন

ঘটনার কিছুক্ষণ আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারণ করা একটি ভিডিওতে মুগ্ধকে বলতে শোনা যায়, ‘এই পানি লাগবে পানি, পানি লাগবে পানি।’

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিও পরবর্তীতে লাখো মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে। আন্দোলনের নানা ঘটনার মধ্যে মুগ্ধের এই মানবিক ডাক হয়ে ওঠে সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক।

মানুষকে ভালোবাসতেন ছোটবেলা থেকেই

বিজ্ঞাপন

১৯৯৮ সালের ৯ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইল এলাকায়। বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান ও মা শাহানা চৌধুরীর তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত এবং যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই মুগ্ধ ছিলেন হাসিখুশি, প্রাণবন্ত এবং অন্যের উপকারে নিবেদিত একজন মানুষ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তার স্বভাবের অংশ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি বিইউপিতে এমবিএ অধ্যয়ন শুরু করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারও গড়ে তুলছিলেন। তিনি বাংলাদেশ স্কাউটসের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং ২০১৯ সালে বনানীর অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে জাতীয় পরিষেবা পুরস্কার অর্জন করেন।

বিজ্ঞাপন

দুই বছর পরও বিচার নিয়ে হতাশ পরিবার

মুগ্ধ নিহত হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হলেও বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তার পরিবার হতাশ। মুগ্ধের যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, দুই বছর ধরে তারা শুধু আশ্বাস পেয়েছেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিচার এগোয়নি।

তার ভাষায়, শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল দ্রুত বিচার। কিন্তু এত সময় পার হলেও বিচার কার্যক্রম এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে মুগ্ধ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ এখনো তারা দেখতে পাননি। বিচারহীনতা শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়, বরং শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতিও অবিচার।

স্নিগ্ধ জানান, মুগ্ধের মৃত্যুর পর থেকে তাদের মা এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। প্রতিটি উৎসব পরিবারটির কাছে শোকের স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে।

তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে গণভবনে যাওয়ার আহ্বান এবং আর্থিক প্রস্তাব দেওয়া হলেও পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে। তাদের ভাষ্য, কোনো অর্থের বিনিময়েই প্রিয়জনের আত্মত্যাগের মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

ট্রাইব্যুনালে ২৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় উত্তরায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।

মুগ্ধসহ মোট ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য, তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, উত্তরা বিভাগের তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারসহ একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে প্রাণঘাতী হামলা চালায়। ১৭ ও ১৮ জুলাই নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে চাইনিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেভাবে প্রাণ হারান মুগ্ধ

বিজ্ঞাপন

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ১৮ জুলাই সকাল থেকেই উত্তরা এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য ও সশস্ত্র ব্যক্তির অবস্থান ছিল। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান, গ্যাস শেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে গুলি চালানো হয়।

আরও পড়ুন

ঠিক সেই সময় উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের রবীন্দ্র সরণির ‘প্রিয় প্রাঙ্গণ’ ভবনের সামনে গুলিবিদ্ধ হন মুগ্ধ। তিনি তখন আহতদের হাসপাতালে নিতে সহায়তা করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন।

পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

একই ঘটনায় আরও হতাহতের অভিযোগ

১৮ জুলাইয়ের ওই সহিংসতায় আরও কয়েকজন নিহত এবং একাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। অভিযোগে বলা হয়েছে, উবারচালক মোখলেসুর রহমান দুর্জয় একটি এপিসির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান। পরে তার মরদেহ গোপন করার উদ্দেশ্যে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। দুই দিন পর টঙ্গীর মরকুন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া ১৯ জুলাই উত্তরার পৃথক আরেকটি সহিংসতায় আরও কয়েকজন নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথক ফরমাল চার্জ জমা দেওয়া হয়েছে।

উভয় মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্দেশ প্রদান, প্ররোচনা, সহায়তা, ষড়যন্ত্র এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের একটি সূত্র জানিয়েছে, অবকাশকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম আরও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তাধীন অন্যান্য ঘটনার প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে নতুন অভিযোগও দাখিল করা হতে পারে।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ‘পানি লাগবে পানি’—এই মানবিক আহ্বান আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। কিন্তু সেই কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো শেষ না হওয়ায় মুগ্ধের পরিবারসহ অনেকের অপেক্ষা রয়ে গেছে ন্যায়বিচারের।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD