শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোতে পারে?

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশত্যাগ করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমে শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে চলতি বছরের মধ্যেই দেশে ফেরার সম্ভাবনার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ে শেখ হাসিনা দণ্ডিত। বিচার চলাকালে তিনি পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়। ফলে তিনি দেশে ফিরলে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারেন, তা নিয়ে আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত সামনে এসেছে।
সোমবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে এক অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে আইনের দৃষ্টিতে কোনো বাধা নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করলে ফৌজদারি কার্যবিধির প্রচলিত নিয়ম অনুসারেই পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও সাংবাদিকদের বলেন, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রবেশে আইনগত কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে তিনি বর্তমানে পলাতক আসামি হিসেবে বিবেচিত এবং ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টিতে তিনি কোন দেশে অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। যদিও বিভিন্ন সূত্রে তার ভারতে অবস্থানের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
চিফ প্রসিকিউটর জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রত্যর্পণ চুক্তি ও বন্দি বিনিময়-সংক্রান্ত ব্যবস্থার আওতায় তাকে দেশে আনার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তিনি চাইলে স্বেচ্ছায়ও দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। তার মতে, যেকোনো দণ্ডিত ব্যক্তি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার রাখেন।
তবে এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের সবাই একমত নন। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বাস্তবিক একটি বড় বাধা হতে পারে তার ভ্রমণ নথি।
তিনি বলেন, দেশ ছাড়ার সময় শেখ হাসিনার কাছে কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট ছিল। পরবর্তীকালে সেটি বাতিল হওয়ায় বর্তমানে তার কাছে বৈধ পাসপোর্ট থাকার সম্ভাবনা কম। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ফিরতে হলে সরকারের কাছ থেকে ট্রাভেল পাস প্রয়োজন হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
তার মতে, ট্রাভেল পাস ইস্যু করা সম্পূর্ণ সরকারের এখতিয়ার। সরকার অনুমোদন দিলে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন। তবে দেশে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তার বিরুদ্ধে জারি থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আপিলের সুযোগ কি থাকবে?
আইনজীবীদের মতে, মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে দণ্ডিত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়া ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি। সে কারণে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করলে তার পক্ষে আপিল করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে। তবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, অতীতেও নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর আপিল গ্রহণের নজির রয়েছে। বিশেষ করে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের আলোকে ‘কমপ্লিট জাস্টিস’ বা পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করে আপিল বিভাগ কয়েকটি ক্ষেত্রে বিলম্বিত আপিল গ্রহণ করেছে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবুল কালাম আজাদের আপিলের বিষয়টি উল্লেখ করেন। পলাতক অবস্থায় দণ্ডিত হওয়ার পর দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকও বলেন, নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলেও আদালত চাইলে আপিল গ্রহণ করতে পারেন। অতীতে ১০ থেকে ১৫ বছর পরও বিভিন্ন মামলায় বিলম্বিত আপিলের উদাহরণ রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আদালত তা গ্রহণ করবেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে মনজিল মোরসেদের মতে, নির্ধারিত সময়ের পরে আপিল করতে হলে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে পৃথক আবেদন করতে হবে। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করলে মূল আপিলের শুনানি শুরু হতে পারে। তার মতে, শেখ হাসিনার আইনজীবীরা নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বিলম্বের ব্যাখ্যা দিতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, আপিল গ্রহণ করা হলে সাধারণত মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার আবেদন করা হয় এবং আদালত বিষয়টি বিবেচনা করেন। এরপর মূল আপিলের শুনানির মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়।
আত্মসমর্পণের পর কী হবে?
বিজ্ঞাপন
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে প্রথমেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাকে কারাগারে যেতে হবে এবং সেখান থেকেই আপিল বা অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, পলাতক অবস্থায় কোনো দণ্ডিত ব্যক্তি আদালতের বিশেষ আইনি সুবিধা দাবি করতে পারেন না। আত্মসমর্পণের পরই তার জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার সব পথ উন্মুক্ত হবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ ফৌজদারি আইনজীবী এস এম শাহজাহানের মতে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়ে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতের শরণাপন্ন হলে তার আপিল আইনগতভাবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ট্রাইব্যুনালে পাঠানো চিঠি নিয়েও আলোচনা
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার কয়েক মাস পর যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আইন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পক্ষে ট্রাইব্যুনালে একটি চিঠি পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ওই চিঠিতে বিচার প্রক্রিয়া ও রায়কে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি বলে দাবি করা হয়েছিল এবং অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
সেই সময় কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
বিজ্ঞাপন
তবে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম দাবি করেছেন, যে আইন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, তাদের অস্তিত্বের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া চিঠিটি আনুষ্ঠানিকভাবে চিফ প্রসিকিউটরের দপ্তরে পাঠানো হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ফলে বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিক নথি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা রায়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, সম্ভাব্য আত্মসমর্পণ, আপিলের সুযোগ, ট্রাভেল পাস এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত—সবকিছুই প্রচলিত আইন ও আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। ফলে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পরবর্তী আইনি পথ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আদালতের সিদ্ধান্ত এবং তৎকালীন পরিস্থিতির ওপর।
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা








