Logo

টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের আতঙ্ক, ঝুঁকিতে হাজারো পরিবার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ জুলাই, ২০২৬, ১৭:৩০
টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের আতঙ্ক, ঝুঁকিতে হাজারো পরিবার
ছবি: সংগৃহীত

টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, প্রশাসনের প্রস্তুতি এবং অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা মিলিয়ে পুরো অঞ্চলে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে বসবাসকারী হাজারো পরিবার এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বান্দরবানের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম হিল ম্যানেজমেন্ট কমিটির তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনো অন্তত ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করছে। বছরের পর বছর উচ্ছেদ অভিযান, আদালতের নির্দেশ এবং পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো পাহাড় ছাড়তে পারেননি। মূলত কম ভাড়ায় বসবাসের সুযোগ এবং বিকল্প আবাসনের অভাবেই তারা ঝুঁকি নিয়েই সেখানে অবস্থান করছেন।

রৌফাবাদ মিয়া পাহাড়, চৌধুরীনগর পাহাড় ও ষোলশহর রেলওয়ে পাহাড় এলাকায় বসবাসকারীরা জানান, টানা বৃষ্টি হলেই আতঙ্ক বেড়ে যায়। পাহাড় থেকে কাদা ও পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করলে অনেকেই রাত জেগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ তাদের নেই।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ১৭৮ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আগামী কয়েক দিন আরও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ সতর্ক করেছে, অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ধস এবং নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে। মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি আটটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধার ও স্থানান্তর কার্যক্রমে প্রস্তুত রয়েছেন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের স্বীকারোক্তি, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পরিবার উচ্ছেদের পর আবারও পাহাড়ে ফিরে আসে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ল্যান্ডস্লাইড ডাটাবেসের তথ্য বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৯ জন। এর মধ্যে ২০০৭ সালের ভয়াবহ ধসে একদিনেই ১২৮ জন নিহত হন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায়ও উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পাহাড় বা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছেন, যা তাদের বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রেখেছে।

গবেষকদের মতে, অপরিকল্পিত বসতি, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত—এসব কারণ মিলেই পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, আকবরশাহ, কুসুমবাগ, বায়েজিদ বোস্তামী, রৌফাবাদ, ফয়েজ লেক ও খুলশীকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আলক পাল বলেন, বাংলাদেশের পাহাড়গুলো মূলত নরম ও অস্থিতিশীল মাটির তৈরি। ফলে সামান্য পাহাড় কাটলেও ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং দীর্ঘ সময়ের বৃষ্টিপাত সহজেই ধসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি অবৈধ বসতি অপসারণ ও ব্যাপক বনায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চট্টগ্রাম মহানগরে পাহাড় কাটা ঠেকাতে ৫০টি অভিযান পরিচালনা করা হলেও অবৈধভাবে পাহাড় কাটার প্রবণতা এখনো বন্ধ হয়নি।

অন্যদিকে, টানা বর্ষণে বান্দরবানেও পাহাড়ধসের ঝুঁকি তীব্র হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাত উপজেলায় ৫ হাজার ৭৫৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করছে, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসতি রয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বৃষ্টির কারণে বান্দরবান-থানচি সড়কের কয়েকটি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটায় সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ধসে পড়া মাটি সরিয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক করেন। পাশাপাশি থানচি, তিন্দু, রেমাক্রী, লামা ও আলীকদমের কয়েকটি সড়কেও চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নিরাপত্তার স্বার্থে আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে থানচির তিন্দু, রেমাক্রী, নাফাখুম ও আমিয়াখুম এলাকায় অন্তত ১০০ পর্যটক আটকা পড়েছেন। নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় তাদের সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের বিনা খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরই মধ্যে আমিয়াখুম এলাকার ১৮ জন পর্যটককে হেঁটে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সাইগং ঝর্ণায় আটকে পড়া ১০ জন উপজেলা সদরে পৌঁছেছেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

এদিকে সীতাকুণ্ডেও টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা বেড়েছে। জঙ্গল সলিমপুর, সোনাইছড়ি, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, বারৈয়াঢালা, লতিফপুর, ছোট দারোগারহাট ও বাড়বকুণ্ডসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্যান্য বছরের মতো এবার প্রশাসনের মাইকিং, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত বা উচ্ছেদ কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়।

বিজ্ঞাপন

তবে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অন্তত ১০০টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তাদের জন্য সমতলের একটি বিদ্যালয় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, মাইকিং করলেও অনেক পরিবার নিজ উদ্যোগে ঘর ছাড়তে রাজি হচ্ছে না।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিবৃষ্টি নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবৈধ পাহাড় কাটা, দখল এবং অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনই বর্তমান ঝুঁকিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। তাদের মতে, স্থায়ী পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া প্রতি বর্ষায় একই ধরনের সংকট ও প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD