জুলাইয়ের রক্তে ভেজা ওসি মাহবুবের হাত

একদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তাক্ত স্মৃতি, অন্যদিকে বিতর্কিত পদায়ন এই দুই বাস্তবতার সংযোগস্থলে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলমের নাম।
বিজ্ঞাপন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানায় দায়িত্ব পালনকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগে তার ভূমিকা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, তা সময়ের সঙ্গে চাপা পড়লেও থেমে যায়নি প্রশ্ন। বরং নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ওঠা আরও কিছু অভিযোগ সেই বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি ও হামলার ঘটনায় তার প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও নেতৃত্ব ছিল ওসি মাহবুব। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বড় কর্তাকে ৭০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে ফতুল্লা থানার ওসি দায়িত্ব নিয়েছেন। সম্প্রতি এ ঘটনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভুগিরা।
নবীনগর এলাকার শিক্ষার্থী সুজন হাসান বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত বা দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ না থাকায় হতাশা আরও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরো বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, শিক্ষার্থীদের দমন-পীড়ন এবং পরবর্তী সময়ে কোনো জবাবদিহির মুখোমুখি না হয়েই গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব পাওয়া সব মিলিয়ে ঘটনাপ্রবাহ জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ফতুল্লা থানায় পদায়নের ক্ষেত্রেও অনিয়ম হয়েছে এবং এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে ওসি মাহবুব আলম জুলাই অভ্যুত্থানের সহিংসতার পুরুস্কার হিসেবে বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর এই পদায়নের পর থেকেই তাকে ঘিরে নতুন করে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ফতুল্লায় যোগদানের পর চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, জমি-সংক্রান্ত বিরোধে প্রভাব বিস্তার এবং মামলা দিয়ে হয়রানির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বহাল তবিয়তে আছেন ফতুল্লা থানার ওসি মাহবুব আলম ।
অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরেও ওসি মাহবুবের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মাহবুব আলম বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দাবি, তিনি কোনো বেআইনি কাজ করেননি এবং তার বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। পুরোনো ঘটনাকে নতুন করে সামনে আনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপারের মুঠো ফোনে যোগাযোগ করলে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
অপরাধ বিশ্লেষক জান্নাতুর রহমান বলেন,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন একটাই যেসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত কবে হবে? অভিযোগকারীরা কি পাবেন ন্যায়বিচার, নাকি অভিযোগগুলো অনির্ধারিত অবস্থাতেই থেকে যাবে? সেই উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেই প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা।
আইন ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।








