Logo

ভুয়া আইনজীবী পরিচয়ে মাদক ব্যবসা, আলোচনায় ‘অস্ত্র জয়নাল’ ও রূপা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ জুলাই, ২০২৬, ১৪:২৮
ভুয়া আইনজীবী পরিচয়ে মাদক ব্যবসা, আলোচনায় ‘অস্ত্র জয়নাল’ ও রূপা
ছবি: সংগৃহীত

আইনজীবী পরিচয়ের আড়ালে রাজধানী ঢাকা, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একটি ভয়ংকর মাদক নেটওয়ার্ক ও ইয়াবা সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে চতুর দম্পতির বিরুদ্ধে। এই চক্রের মূল হোতা সাবিনা মুস্তারি রূপা এবং তার চতুর্থ স্বামী মোহাম্মদ জয়নাল সরদার, যিনি অপরাধ জগতে ‘অস্ত্র জয়নাল’ নামে পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

পটুয়াখালী জজকোর্ট এবং বর্তমানে ঢাকা জজ কোর্টে জুনিয়র উকিল পরিচয় দিয়ে বেড়ানো এই রূপার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র তৃতীয় শ্রেণী হলেও, চতুরতার আশ্রয় নিয়ে তিনি ও তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক ব্যবসা ও সেবন চালিয়ে আসছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

পটুয়াখালীর গলাচিপা থানার বাঁশবাড়ীয়া এলাকার মৃত সুলতান সরদারের ছেলে জয়নালের বয়স বর্তমানে ৪৫ বছর এবং কিশোরগঞ্জ সদরের হারুয়া এলাকার মীর আনোয়ার আকবাল শাহীনের মেয়ে রূপার বয়স ৩৮ বছর। কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী ঠিকানা না রেখে ঘন ঘন বাসা পরিবর্তন করে ঢাকায় যাযাবর জীবন যাপন করা এই দম্পতির মূল কৌশল, যাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহজে তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে না পারে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও নিজেদের অবৈধ মাদক কারবার নির্বিঘ্ন করতে এই চক্রটি এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করে আসছিল। তারা যখন যে এলাকায় অবস্থান করে, সেখানকার প্রভাবশালী বা পঞ্চায়েত প্রধানদের কৌশলে ‘ধর্মের বাপ’ বা ‘ধর্মের ভাই’ ডেকে ম্যানেজ করে এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে।

বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় এক প্রভাবশালী কমিশনারের আশ্রয়ে এবং কলাগাছিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাইনুল শিকদারের ছত্রছায়ায় এই দম্পতি এলাকায় দেদারসে মাদক বিক্রি করতো বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই রূপা বর্তমানে মোফাজ্জেল মোল্লাকে 'বাপ' ডেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুরাদমে মাদক বিজনেস চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে এলাকায় এখন আর তাকে বাধা দেওয়ার মতো কেউ সাহস পাচ্ছে না। এই চক্রটির কারণে কলাগাছিয়া এলাকাসহ স্থানীয় যুবসমাজ আজ ধ্বংসের মুখে।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে রূপার আরও এক চাঞ্চল্যকর অপরাধের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কিছুদিন আগে সে সৌদি আরব গিয়েছিলো। কিন্তু সেখানেও সে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও চুরির মতো জঘন্য অপরাধে জড়ায়। একপর্যায়ে চুরির সময় হাতেনাতে ধরা পড়লে সেখানকার কর্তৃপক্ষ শাস্তিস্বরূপ রূপার মাথার চুল কেটে ন্যাড়া করে দেয় এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। সচেতন মহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, এই ধরনের অপরাধী নারী একটা পবিত্র দেশে গিয়েও নিজের অপকর্ম থেকে বিরত থাকতে পারেনি।

সম্প্রতি এই দম্পতির মাদক সেবনের কয়েকটি গোপন ভিডিও ক্লিপ গণমাধ্যমের হাতে এসেছে, যা তাদের অপরাধের অকাট্য প্রমাণ বহন করে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাদক সেবনরত অবস্থায় বিকৃত ও আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গিতে ইয়াবা সেবন করছেন রূপা, যেখানে তার পরনে ছিল একটি গোলাপি রঙের ওড়না এবং সাদা-নীল রঙের জামা। অন্য একটি ২০ সেকেন্ডের ভিডিওতে রূপাকে তার চতুর্থ স্বামীর সাথেও চরমভাবে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখা গেছে। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এই রূপা এর আগে তিনটি বিয়ে করেছেন এবং নিজের সন্তান ও পূর্বের স্বামীদের কোনো খোঁজখবর না নিয়ে সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অপরাধমূলক জীবন বেছে নিয়েছে।

বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর- ২৩৭০৮৫৬১৩৬ ধারী এই সাবিনা মুস্তারি রূপা তার চতুর্থ স্বামী অস্ত্র জয়নালকে সাথে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কলাগাছিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মারফ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনজীবী পেশাটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। মাত্র তৃতীয় শ্রেণী পাস করে কেউ যদি জজ কোর্টের আইনজীবী পরিচয় দিয়ে বেড়ায় এবং মাদক ব্যবসার মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত থাকে, তবে তা পুরো আইনজীবী সমাজের জন্য কলঙ্কজনক। আমরা বার অ্যাসোসিয়েশনকে অনুরোধ করব এই ভুয়া আইনজীবীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে।

আইনজীবী পরিচয় জালিয়াতি প্রসঙ্গে পটুয়াখালী জজ কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. খলিলুর রহমান বলেন, আমাদের পটুয়াখালী বারে এই নামের কোনো নিবন্ধিত বা নিয়মিত জুনিয়র আইনজীবী নেই। পরিচয় জালিয়াতি করে যারা আদালত প্রাঙ্গণ ও আইনজীবীদের নাম ব্যবহার করে অপরাধ করে, তারা মূলত প্রতারক। প্রশাসনের উচিত এদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেওয়া।

রূপার চতুরতার শিকার হওয়া একজন সাধারণ আইনসেবা গৃহীতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) তার তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, আমি একটি মামলার বিষয়ে পরামর্শের জন্য ঢাকা জজ কোর্ট এলাকায় গেলে এই নারী নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে আমার সাথে পরিচিত হন। তিনি অল্প টাকায় মামলা মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আমার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তিনি কোনো আইনজীবীই নন, বরং একজন ভুয়া ও প্রতারক।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ভুয়া পরিচয় ও মাদক সিন্ডিকেটের আইনি পরিণতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী আইনজীবীর ভুয়া পরিচয় দেওয়া একটি গুরুতর অপরাধ। এর ওপর যদি মাদক ব্যবসা এবং অস্ত্র সংশ্লিষ্টতার (অস্ত্র জয়নাল) অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও অস্ত্র আইনে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। এই ধরনের অপরাধীদের সমাজে অবাধে ঘুরে বেড়ানো আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সাবিনা মুস্তারি রূপা ও তার স্বামী মোহাম্মদ জয়নাল সরদারের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

একটি সাধারণ পরিবার থেকে এসে মাত্র তৃতীয় শ্রেণী পাস করে জজকোর্টের ভুয়া আইনজীবী পরিচয় দেওয়া, অবলীলায় ইয়াবা ও অস্ত্রের প্রভাব খাটানো এবং পবিত্র দেশ সৌদি আরবে গিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করায় ক্ষুব্ধ সচেতন মহল। সাধারণ মানুষের দাবি, এই ছদ্মবেশী যাযাবর মাদক ব্যবসায়ী দম্পতিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে তারা সমাজকে আরও বেশি কলুষিত করবে।

বিজ্ঞাপন

‘অস্ত্র জয়নাল’ ও ভুয়া আইনজীবী রূপার এই দেশব্যাপী মাদক ও ইয়াবা নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে এবং তাদের বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেফতারি অভিযান চালাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD