Logo

ম্যারাডোনা-মেসি : কেন বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার এত জনপ্রিয়তা?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২ জুলাই, ২০২৬, ১৫:৩৮
ম্যারাডোনা-মেসি : কেন বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার এত জনপ্রিয়তা?
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের অলিগলি, শহর-বন্দর কিংবা গ্রাম—সবখানেই যেন নেমে আসে ফুটবল উৎসব। আকাশী-সাদা পতাকায় ছেয়ে যায় ছাদ, রাস্তাঘাট আর বাড়ির আঙিনা। লিওনেল মেসি কিংবা দিয়েগো ম্যারাডোনার নামে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে হাজারো সমর্থক। অথচ বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনোই জায়গা হয়নি বাংলাদেশের। তারপরও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে এই অসাধারণ উন্মাদনার পেছনে রয়েছে ইতিহাস, আবেগ, সংস্কৃতি এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া এক অনন্য ভালোবাসার গল্প।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপের ম্যাচে বড় পর্দার সামনে হাজারো সমর্থকের ‘আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা’ কিংবা ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনি শুনলে অনেকেরই মনে হতে পারে এটি আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ার্সের কোনো দৃশ্য। কিন্তু বাস্তবে সেটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার চিত্র। বিশ্বকাপ চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন দৃশ্য নিয়মিতই দেখা যায়।

ম্যারাডোনার হাত ধরেই শুরু ভালোবাসা

ঢাকার বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী আব্দুল হাইয়ের মতো অসংখ্য বাংলাদেশির আর্জেন্টিনা-প্রেমের শুরু ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে। সেই আসরে দিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকে পরিণত হন তারা।

বিজ্ঞাপন

আব্দুল হাইয়ের ভাষায়, ম্যারাডোনার খেলার ধরণ, ড্রিবলিং, আবেগ, এমনকি বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলও তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। সেই সময় থেকেই আর্জেন্টিনা তার প্রিয় দল হয়ে ওঠে।

এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছর বিশ্বকাপ শিরোপার অপেক্ষায় থাকতে হয় আর্জেন্টিনাকে। অবশেষে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। আব্দুল হাই বলেন, মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেখার পর তার ফুটবলজীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

১৯৮৬ বিশ্বকাপ বদলে দেয় সমর্থনের চিত্র

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিকের মতে, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

তার ব্যাখ্যায়, ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয় এবং ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্য বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। যদিও এর আগে দেশে ব্রাজিলের সমর্থকই বেশি ছিলেন, তবে ম্যারাডোনার অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে তার আবেগঘন কান্না অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এরপর থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।

বিজ্ঞাপন

মেসির যুগে নতুন প্রজন্মের ভালোবাসা

বর্তমান প্রজন্মের অনেক সমর্থকের কাছে ম্যারাডোনার চেয়ে মেসিই বড় অনুপ্রেরণা। তরুণদের বড় একটি অংশ মেসির খেলা দেখেই আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছেন।

বেসরকারি চাকরিজীবী দ্বীন ইসলাম জানান, ছোটবেলা থেকেই মেসির খেলা দেখে বড় হয়েছেন তিনি। সেই ভালোবাসা থেকেই আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেন।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে মোহাম্মদ জহিরের মতো অনেকে আবার পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছেন। তার বাবা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করতেন, সেই আবেগই ছেলের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ফুটবল উন্মাদনা পৌঁছেছে কূটনীতিতেও

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি অগাধ ভালোবাসা শুধু খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর প্রভাব পড়েছে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরপর ২০২৩ সালে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ঢাকায় পুনরায় দূতাবাস চালু করে আর্জেন্টিনা। এর আগে ১৯৭৮ সালে বাজেট সংকটের কারণে দেশটি ঢাকার দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছিল।

বর্তমানে বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতও স্থানীয় সমর্থকদের সঙ্গে বসে বিশ্বকাপের ম্যাচ উপভোগ করেন, যা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

বিজ্ঞাপন

নায়ক খোঁজার প্রবণতাই জনপ্রিয়তার বড় কারণ

ক্রীড়া সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার শাহনূর রাব্বানীর মতে, বাংলাদেশের মানুষ দলগত খেলার মধ্যেও একজন মহানায়ককে খুঁজে নিতে পছন্দ করে। সেই কারণেই ম্যারাডোনা, রোনালদো, রিভালদো, মেসি কিংবা নেইমারের মতো তারকারা এখানে অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার আধিপত্য এবং কিংবদন্তি ফুটবলারদের উপস্থিতি বাংলাদেশের দর্শকদের এই দুই দলের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।

বিজ্ঞাপন

একই পরিবারের ভেতরেও বিভক্ত সমর্থন

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থন অনেক সময় একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও মজার প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমান আর্জেন্টিনার সমর্থক হলেও তার ছোট ভাই আইমান ব্রাজিলের ভক্ত। তাদের বাবা আর্জেন্টিনা এবং মা ব্রাজিলকে সমর্থন করেন। বিশ্বকাপ এলেই পুরো পরিবারে শুরু হয় ফুটবল নিয়ে হাসি-ঠাট্টা ও খুনসুটি।

আবেগ আছে, সাফল্য নেই দেশের ফুটবলে

বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে এত উন্মাদনা থাকলেও জাতীয় দলের সাফল্য এখনো প্রত্যাশার অনেক নিচে। বর্তমানে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১ নম্বরে।

বিজ্ঞাপন

এ নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে শাহনূর রাব্বানী বলেন, দেশের মানুষের এত ভালোবাসা ও আবেগ থাকা সত্ত্বেও ফুটবলের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর একাডেমির অভাব রয়েছে। ফলে অনেক প্রতিভাবান তরুণও সঠিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান না।

একই মত দিয়েছেন সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিকও। তার মতে, একসময় দেশে ফুটবলের সুন্দর পরিবেশ থাকলেও নতুন খেলোয়াড় তৈরির জন্য ধারাবাহিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। তবে তরুণ প্রজন্ম এখনই বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন না দেখলেও তারা চায় বাংলাদেশের ফুটবল সঠিক পরিকল্পনা ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাক।

সূত্র: আল-জাজিরা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD