বাপেক্স টেন্ডারের স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয়

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রিগ ক্রয় টেন্ডারকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রায় ২ হাজার অশ্বশক্তিসম্পন্ন এসি-এসি ভিএফডি ড্রিলিং রিগ ক্রয়ের এই প্রকল্পে যোগ্যতা নির্ধারণের কিছু শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণকারী মহলের একটি অংশ। তাদের অভিযোগ, টেন্ডারের কিছু শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং বহু দেশে বৃহৎ জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থাকা প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যেতে পারে।
এমনকি অতীতে বাপেক্সের প্রকল্পে সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে টেন্ডার নথির আইটিটি ধারা ১৩.১(খ)-এ নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। নোটিশে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ইপিসি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত মূল যন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা ওইইএমের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
কিন্তু বর্তমান টেন্ডারে সেই অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। নোটিশে আরও জানতে চাওয়া হয়, কেন প্রস্তাবিত ওইইএমের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না এবং কেন এমন শর্ত রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ ও সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত করতে পারে। সম্প্রতি বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক ও প্রকল্প পরিচালক আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে টেন্ডারে জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বেশ কয়েকজন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। তারা অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রশ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়েই মূল্যায়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বাপেক্সের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চসংখ্যক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া।
বিজ্ঞাপন
একজন ক্রয়নীতি বিশেষজ্ঞ বলেন, “যোগ্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্য হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা। কিন্তু যদি শর্ত এমন হয়, যাতে অনেক যোগ্য প্রতিষ্ঠান শুরুতেই বাদ পড়ে যায়, তাহলে প্রতিযোগিতার পরিধি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।”
তার মতে, প্রতিযোগিতা কমে গেলে সরকারের দর-কষাকষির সক্ষমতাও কমে যেতে পারে। জ্বালানি খাত বিশ্লেষক রাজু আহমেদ শাহ বলেন, “আন্তর্জাতিকভাবে বড় প্রকল্পে অনেক সময় ইপিসি ঠিকাদার ও মূল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজ করে। সে ক্ষেত্রে শুধু একটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার মানদণ্ডকে গুরুত্ব দিয়ে অন্য সক্ষমতাকে উপেক্ষা করলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।” সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, অতীতে বাপেক্সের প্রকল্পে সফলভাবে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাবেক জ্বালানি কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্ববর্তী কর্মসম্পাদন, সময়মতো প্রকল্প শেষ করার সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এসব তথ্য মূল্যায়নে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।” তাঁর মতে, পূর্ব অভিজ্ঞতা একমাত্র মানদণ্ড না হলেও এটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানী বিশেষজ্ঞ আলদ্দিন হোসেন বলেন, প্রতিযোগিতা সীমিত হলে শুধু সম্ভাব্য মূল্য সুবিধাই কমে যায় না, বরং উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং বিকল্প সমাধান পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বড় সরকারি প্রকল্পে অধিকসংখ্যক যোগ্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্র তুলনামূলক ভালো শর্তে পণ্য ও সেবা পাওয়ার সুযোগ পায়। তাদের মতে, জ্বালানি খাতের মতো কৌশলগত খাতে নেওয়া সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব থাকে। ফলে টেন্ডার মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া জরুরি।
সুশাসন ও সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, বিতর্ক এড়াতে পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
তারা বলছেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, কেন্দ্রীয় সরকারি ক্রয় কারিগরি ইউনিট (সিপিটিইউ) এবং অন্যান্য তদারকি সংস্থা চাইলে যোগ্যতা শর্তের যৌক্তিকতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারে।
তাদের মতে, যদি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই হয়ে থাকে, তাহলে স্বাধীন পর্যালোচনা সেই অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। আর যদি কোনো অসঙ্গতি থাকে, তাহলে তা সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এখন প্রশ্ন রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রকৃত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং সমান সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে?
বাপেক্সের এই রিগ ক্রয় টেন্ডারে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ইপিসি প্রতিষ্ঠান, অভিজ্ঞ ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ যখন প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছে, তখন মূল প্রশ্ন একটাই।
বিজ্ঞাপন
আগামী পর্বে থাকছে প্রকল্প পরিচালকসহ বড় কর্তাদের পকেটে ঘুষের টাকা








