Logo

কোটি কোটি টাকা ব্যয়েও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ সিটি কর্পোরেশন

profile picture
আল-আমিন
১৪ জুন, ২০২৬, ১৯:৫৩
কোটি কোটি টাকা ব্যয়েও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ সিটি কর্পোরেশন
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

বর্ষা মৌসুমের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম এখনও অনেকটাই প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ না নিলে এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় চার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, সর্বশেষ ১০ দিনে প্রায় ৭০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা সংক্রমণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সাম্প্রতিক জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৮টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জরিপের আওতায় ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ২৮১টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা শনাক্ত হয়েছে। বহুতল ভবনে সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়া একক বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন ও সেমিপাকা বাসাবাড়িতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মশার প্রজননক্ষেত্র শনাক্ত হয়েছে। জমে থাকা পানি, বালতি, প্লাস্টিক ড্রামসহ বিভিন্ন পাত্রে এডিসের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে।

যেখানে দক্ষিণ সিটি নিজস্ব উদ্যোগে জরিপ পরিচালনা করেছে, সেখানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এখনও এ ধরনের কোনো বিস্তৃত জরিপ করেনি বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যয় বাড়লেও সুফল মিলছে না

গত এক দশকে মশা নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ডিএনসিসি মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে প্রায় ৬৮৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ডিএসসিসির ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরেও উত্তর সিটি ১৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং দক্ষিণ সিটি ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। কিন্তু এত অর্থ ব্যয়ের পরও মশার উপদ্রব কিংবা ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য দেখা যায়নি বলে মনে করছেন নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

বিগত বছরগুলোতে মশার উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার, জলাশয়ে ব্যাঙ, হাঁস, গাপ্পি ও তেলাপিয়া মাছ অবমুক্ত করা, বাউল গান ও জিঙ্গেলের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি।

নাগরিকদের অভিযোগ

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে মশা নিধন কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ে না। অনেকের অভিযোগ, মাঝে মধ্যে ওষুধ ছিটানো হলেও তা নিয়মিত নয়।

বিজ্ঞাপন

বাসাবোর এক বাসিন্দা জানান, আশপাশে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তারা নিজেদের বাড়িঘর পরিষ্কার রাখলেও সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর উপস্থিতি খুব কম দেখা যায়।

বাড্ডা এলাকার আরেক বাসিন্দার মতে, ডেঙ্গুর মৌসুম সামনে থাকলেও মশা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

জনবল সংকটের কথা বলছে সিটি কর্পোরেশন

বিজ্ঞাপন

দুই সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান, ওষুধ ছিটানো, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

তবে কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় প্রতিটি ওয়ার্ডে বড় পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগেই যে ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

কাউন্সিলর না থাকায় তদারকিতেও ঘাটতি

বিজ্ঞাপন

গত দুই বছর ধরে সিটি কর্পোরেশনগুলোতে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ের তদারকি ও সমন্বয় দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব মশক নিধন কার্যক্রমেও পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে। শুধুমাত্র ফগিং নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। বিশেষ করে বর্ষাকালে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি দ্রুত অপসারণ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা ও প্রয়োগ পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে জনসচেতনতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানো ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু রাসায়নিক নির্ভর ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পিত নগরায়ন, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সমন্বয় ঘটাতে হবে।

বিজ্ঞাপন

নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর জোর

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, জরিপের ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে নগরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া এ লড়াই সফল হবে না।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। তাই বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন এবং আশপাশের খোলা জায়গায় কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না গেলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD