Logo

পর্যটকশূন্য কক্সবাজার, বাড়ছে ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার
৯ জুন, ২০২৬, ১৭:১৮
পর্যটকশূন্য কক্সবাজার, বাড়ছে ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা
ছবি: সংগৃহীত

দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে ঈদের পর পর্যটন কার্যক্রমে কিছুটা গতি ফিরলেও সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়া ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সেই গতি আবারও কমে গেছে। একদিকে অনিয়মিত বৃষ্টি, অন্যদিকে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সৈকত এলাকায় পর্যটকের উপস্থিতি কমে এসেছে। এর ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, বিনোদন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ পুরো পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কয়েক দিনের মধ্যেই হাজারো পর্যটক নির্ধারিত সময়ের আগেই সফর শেষ করে ফিরেছেন কিংবা পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এতে সম্ভাব্য কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের মধ্যে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক সময় ট্রান্সফরমারেও কারিগরি সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

পিডিবির কক্সবাজার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমিত সরবরাহের মধ্যেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় পুরোপুরি সংকট কাটানো সম্ভব হচ্ছে না।

মঙ্গলবার (৯ জুন) কক্সবাজারের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী ও ইনানী সৈকত ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ সময়ের তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সমুদ্রস্নান, বিচ বাইক চালানো, ঘোড়ায় চড়া, প্যারাসেইলিং এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক কার্যক্রমেও আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই।

বিজ্ঞাপন

পর্যটকদের অনেকে জানান, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যুতের সমস্যার কারণে কাঙ্ক্ষিত আনন্দ উপভোগ করতে পারছেন না। ফলে অনেকেই নির্ধারিত সময়ের আগেই ভ্রমণ শেষ করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

রাজধানী ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা এক পর্যটক জানান, কয়েক দিনের জন্য অবস্থানের পরিকল্পনা থাকলেও বিদ্যুৎ সংকট ও আবহাওয়ার কারণে সফর সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে।

চট্টগ্রাম থেকে আসা আরেক পর্যটকের অভিযোগ, হোটেলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকায় আরামদায়ক পরিবেশ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সময় কাটানোর জন্য বাইরে থাকতে হচ্ছে। পর্যটননির্ভর একটি শহরে এমন পরিস্থিতি হতাশাজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে পর্যটকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকেই বুকিং বাতিল করছেন, আবার কেউ কেউ দুই বা তিন দিনের পরিবর্তে মাত্র এক দিন অবস্থান করে ফিরে যাচ্ছেন।

হোটেল মালিকদের সংগঠনের নেতাদের দাবি, গত কয়েক দিনে কয়েক হাজার পর্যটক সফর বাতিল বা সংক্ষিপ্ত করেছেন। একজন পর্যটক গড়ে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন, সেই হিসাব অনুযায়ী পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ইতোমধ্যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হোটেল ও রিসোর্ট মালিকরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে পর্যটকদের মানসম্মত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

তাদের মতে, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে পর্যটকদের সন্তুষ্টি ধরে রাখা কঠিন হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পর্যটন খাতের ওপর পড়বে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটন খাত শুধু হোটেল বা রিসোর্টকেন্দ্রিক নয়। সৈকতসংলগ্ন ছোট দোকান, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ফটোগ্রাফি, বিনোদনসেবা, রিকশা ও ইজিবাইক চালক—সবার আয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল।

বিজ্ঞাপন

পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এসব খাতেও আয় কমে গেছে। ফলে হাজার হাজার মানুষের জীবিকায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

এদিকে উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর সঞ্চারণশীল মেঘমালার প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় বিরূপ আবহাওয়া বিরাজ করছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারসহ আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারি করেছে।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়া কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষের জীবিকা পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পর্যটক কমে গেলে এর প্রভাব শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতির প্রায় সব স্তরেই ছড়িয়ে পড়ে।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে সামনের দিনগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD