Logo

উজিরপুরে সংখ্যালঘুদের মূর্তিমান আতঙ্ক ফিরোজ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
বরিশাল
৭ জুন, ২০২৬, ২১:৪৬
উজিরপুরে সংখ্যালঘুদের মূর্তিমান আতঙ্ক ফিরোজ
ফিরোজ। ফাইল ছবি

এমদাদুল কাশেম সেন্টু উজিরপুর: বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা মুফতি মাসুদ হাসান ফিরোজের বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পৈতৃক সম্পত্তির বৈধ মালিক হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজেদের জমির দখল ফিরে পাচ্ছেন না। অপরদিকে অভিযুক্ত ফিরোজ অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হয়নি। ফলে ঘটনাটি ঘিরে জমির মালিকানা, প্রভাবের রাজনীতি এবং প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরোজমিন ঘুরে দেখা যায়, গুঠিয়া মৌজার এসএ ৪০৮ নম্বর দাগভুক্ত ১১ শতাংশ জমি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে চার তলা ভবন নির্মান কাজ চলামান রয়েছে। সংখ্যালঘু পরিবারের দাবি বৈধ কাগজপত্র এবং ওয়ারিশ সূত্রে মালিকানা থাকার পরও অসীম কুমার দাস, সুব্রত কুমার দাস ও সুশান্ত কুমার দাস জমির প্রকৃত ভোগদখল থেকে বঞ্চিত। শুধু সংখ্যালঘু পরিবার নয়, শংকরপুরের মামুন সরদারের জমিও দখল করেছেন এই মুফতি ফিরোজ। সবশেষে জমি বুঝে না পেয়ে হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয় কিছু বাসিন্দাদের দাবি, ফিরোজ সংখ্যালঘু কিংবা মামুনের জমি দখল করেননি। তিনি তার বসত ঘরে পাশে মাদ্রাসা নির্মান করেন। এই সুযোগ বিভিন্ন অনুদানের নামে শুরু করে চাঁদাবাজী। মাদ্রাসার কোনো উন্নয়ন না করে সেই টাকা দিয়ে সে নিজ নামে শত বিঘা জমি দলিল করেছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ক্ষমতাসীন নেতাদের ছত্রছায়া ও নেক নজরে থেকে জমি দখলের নেশায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল তিনি। গত ১৭ বছর গুঠিয়া ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন মুফতি ফিরোজ বাহিনী। তার বিরুদ্ধে থানায় কিংবা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগ দিলে মুহুত্বেই নথি গায়েব করে দেন তিনি। কালো টাকার জোরে নিজেকে মনে করেন ক্ষমতাধর ব্যক্তি।

বিজ্ঞাপন

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাতারাতি ভোল পাল্টিয়ে জামায়াতের শিবিরে হয়ে গেছেন ফিরোজ। মুখে চরমোনাই, অন্তরে শিবির। আর সহযোগিতায় নেপথ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ। এরপর থেকে ফিরোজ ও তার বাহিনীর সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হাসিনার পলায়ন ও ফ্যাসিস্ট সরকারে পতনের মধ্য দিয়ে দেশবাসী নতুন মুক্তির স্বাদ পেলেও গুঠিয়ায় এখনও ত্রাসের রাজত্বে ভয়ে তটস্থ দিন যাপন করছে। মুফতি ফিরোজ বাহিনীর অন্যায়-অপরাধের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না এই অঞ্চলের মানুষ।

কিন্তু দায় গিয়ে পড়ছে বিএনপির ঘারে। সবাই মনে করেন সব দোষ বিএনপির। এদিকে গুঠিয়া ইউনিয়নকে দখল-দারিত্ব মুক্ত রাখার ঘোষনা দিয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন হাওলাদার। তিনি বলেন, বিএনপি মানুষের নিরাপত্তা নিতে প্রস্তুত। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অন্যায় ভাবে কারো জমি দখল করলে প্রমাণ পেলে বহিস্কার করা হবে।

এ বিষয় নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মুফতি ফিরোজ বিএনপির কোনো লোক নন। তিনি চরমোনাই পীরের দল করেন। এখন আবার শুনছি জামায়াতের সঙ্গে মিশে গেছে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কাদে ভর করে জমি দখলে নেশায় ব্যস্ত ছিলো। এখন শুরু করেছেন সংখ্যালঘু পরিবারের উপর নির্যাতন। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই মিথ্যা মামলা ও হামলার ভয় দেখান। তাই কেউ ভয়ে সাহস করেন না।

বিজ্ঞাপন

এক সূত্র বলছে, সম্প্রতি দিন-দুপুরে হঠাৎ করে জঙ্গি স্টাইলে অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র মহড়া দিতে দেখা যায় এর পর সংখ্যালঘু পরিবারের সেই ভবনে মুফতি ফিরোজ বাহিনী নেতৃত্বে সংখ্যালঘু পরিবারের সেই ভবনে সিনেমাটিক স্টাইলে তান্ডব চালায় শুধু তান্ডব চালায় এবং সংখ্যালঘুদের প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেয় এর পর তারা আনান্দ মিছিল করেন। মুহুত্বেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গুঠিয়া ইউনিয়নে। শুধু সংখ্যালঘু নই মুফতি ফিরোজ বাহিনীর অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও। ফিরোজের অত্যাচারের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ টুঁ শব্দটিও করতে সাহস পাচ্ছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী ক্ষোভের সঙ্গে জানান, আমি সংখ্যালঘু বলে কি সুবিচার পাবো না। মানোনীয় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের দিকে একটু সুদৃষ্টি দের, আমাদের কে এই ভূমি খেকো ফিরোজের হাত থেকে বাচান। যাতে বাবা-দাদার ভিটে মাটি অন্তত বুঝে পাই।

অন্য এক সূত্র বলছে, মুফতি মাসুদ হাসান ফিরোজ স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক। তিনি রাতারাতি দখলদারিত্ব করে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু পরিবারের একাধিক সম্পতি দখল করে নেওয়ার অভিযোগ আছে। আর কেউ প্রািতবাদ করলেই বিভিন্ন মামলায় ঢুকিয়ে দেন।

বিজ্ঞাপন

নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাক্তি বলেন, প্রভাব-প্রতিপত্তি ব্যবহার করে জমি দখল করে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। আর এর প্রতিবাদ করায় জমির মালিক তিন সংখ্যালঘু পরিবারের নামে মামলা দিয়ে এলাকা ছাড়া করেছে ফিরোজ।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর সমাধানে পৌঁছায়নি। অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, প্রতিবারই কোনো না কোনো কারণে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ফলে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ আদালত বা প্রশাসনিক নিষ্পত্তির পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তায় আটকে থাকে। যতবার তারিখ নির্ধারন করা হয় সেই বৈঠকে একবার হাজির হয়নি মুফতি ফিরোজ। তিনি জোর করে জমি দখলে নিবেন কিন্তু সমাধান করবেন না।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর চাপ ও ভীতি প্রদর্শনের মাত্রা বেড়েছে। তারা দাবি করেন, এলাকা ছাড়ার হুমকি এবং মানসিক হয়রানির কারণে পরিবারটি চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। সবার মধ্য এক আতঙ্ক মুফতি ফিরোজ।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ করেন, পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত ওই জমি দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরিবার ভোগদখলে রেখে আসলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, চরমোনাই আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উজিরপুর উপজেলা শাখার মুজাহিদ কমিটির সভাপতি মাসুদ হাসান ফিরোজ জোরপূর্বক জমিটি দখল করে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন।

ভুক্তভোগীরা বলেন, জমি নিয়ে ঝামেলা মেটাতে এলাকায় কয়েকবার বসার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি নানা অজুহাতে তা হতে দেননি। উল্টো তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং ভয়ভীতি দেখান। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা জমি ফিরে পাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো কার্যকর সমাধান পাননি। এমনকি জমি নিয়ে প্রতিবাদ করায় তাদের পরিবারকে বিভিন্ন সময় হুমকি-ধমকির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

তারা আরো বলেন, আমরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছি। জমি দখল ও নানা হুমকির কারণে আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। পরিবার-পরিজন নিয়ে আতঙ্কে বসবাস করছি।

বিজ্ঞাপন

বিষয়টি পরবর্তীতে উজিরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও গুঠিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন হাওলাদার এবং গুঠিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লাভলু হোসেনকে অবহিত করা হলে তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। বর্তমানে সংখ্যালঘু পরিবার নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে পারলেও আতঙ্ক এখনো কাটেনি। এদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সু-দৃষ্টি কামনা করছেন সংখ্যালঘু পরিবার।

ভুক্তভুগি অসীম কুমার দাস বলেন, “ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি এখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” ফিরোজ আমাদের হত্যা হুমকি দিচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মাসুদ হাসান ফিরোজ জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার পূর্ণাঙ্গ অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

উজিরপুর মডেল থানা-এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ বিশ্লেষক রাসিম মোল্লা বলেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে জমির মালিকানা, দখল এবং রেকর্ড সংক্রান্ত জটিলতা বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্ম দেয়। বিশেষ করে যখন কোনো পক্ষ প্রভাবশালী এবং অন্য পক্ষ সামাজিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থানে থাকে, তখন বিরোধ আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আবেগ বা প্রভাবের বদলে খতিয়ান, পর্চা, দলিল, নামজারি, কর পরিশোধের রেকর্ড এবং আদালতের নথি যাচাই করেই প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করা উচিত। কেউ জালিয়াতি করে জমি দলিল কিংবা নাম খারিজ বের করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD