Logo

আদ-দ্বীন হাসপাতাল মানুষ হত্যার কারখানা!

profile picture
বশির হোসেন খান
১ জুন, ২০২৬, ১১:৩৪
আদ-দ্বীন হাসপাতাল মানুষ হত্যার কারখানা!
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারের ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বাইরে জীবনের স্বাভাবিক গতি, ভেতরে অস্বাভাবিক ভারী এক নীরবতা।

বিজ্ঞাপন

নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পুরো হাসপাতাল ঘিরে তৈরি হয়েছে চাপা উত্তেজনা, শোক এবং নানা প্রশ্ন। এই যেনো হাসপাতাল নয়, মানুষ হত্যার কারখানা।

হাসপাতালের মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে ব্যস্ত রোগী, স্বজন, অ্যাম্বুলেন্সের আনাগোনা। বাইরে স্বাভাবিক হাসপাতাল জীবনের ছন্দ থাকলেও ভেতরে প্রবেশ করতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। বিশেষ করে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট এর দিকে এগোতেই পরিবেশ হয়ে ওঠে অস্বাভাবিকভাবে নীরব ও ভারী। করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের মুখে কোনো স্বস্তি নেই।

কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন, কেউ বারবার মোবাইল ফোনে কারও খোঁজ নিচ্ছেন, আবার কেউ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন হাসপাতালের ভেতরের দরজার দিকে। কথার চেয়ে এখানে নীরবতাই বেশি জোরালো। ভেতর থেকে মাঝে মাঝে স্টাফদের দ্রুত চলাফেরা দেখা যায়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কোথাও কোনো খোলামেলা তথ্য বিনিময় নেই। প্রশ্ন করলে সংক্ষিপ্ত উত্তর, অনেক ক্ষেত্রে নীরবতা এই দুটোর মাঝেই আটকে আছে পুরো পরিবেশ। সেই ছয় নবজাতকের মায়েরা সন্তানকে বুকে নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা নতুন অতিথিকে ঘিরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন রূপ নেয় অসহনীয় শোকে।

একজন স্বজনের কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ “আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না শুধু অপেক্ষা করছি।” আরেকজনের চোখে ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তা একটার পর একটা খবর আসছে কিন্তু সত্যটা কেউ বলছে না। নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটির সামনে ভিড় তুলনামূলক কম, কিন্তু সেই কম ভিড়ই যেন আরও ভারী। দরজার ওপারে কী চলছে এই অজানা অংশই তৈরি করছে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি।

হাসপাতালের এই অংশে সময় যেন স্বাভাবিক গতিতে চলছে না। প্রতিটি মিনিট দীর্ঘ মনে হচ্ছে, প্রতিটি অপেক্ষা আরও ভারী হয়ে উঠছে। বাইরে জীবনের স্বাভাবিক শব্দ থাকলেও ভেতরে অনুভূত হচ্ছে চাপা শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন

সব মিলিয়ে সরেজমিন চিত্র একটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে এখানে শুধুই চিকিৎসা চলমান নয়, চলমান এক গভীর প্রশ্নের চাপা উত্তেজনাও, যার উত্তর এখনো অজানা।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ অর্থে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক হাসপাতাল নয়। অলাভজনক দাতব্য সংস্থা হিসেবে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের অধীনে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল পরিচালিত হয় বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক ধারায় হাসপাতালটি পরিচালনা করা হচ্ছিল। যার বদান্যতায় কর থেকে অব্যাহতির সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আকিজ গ্রুপের বিরুদ্ধে। বর্তমানে একই সুবিধা নিচ্ছে আকিজ-বশির গ্রুপও।

১৯৮০ সালে আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দীন এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ হোসেনের যৌথ উদ্যোগে আদ্-দ্বীনের কার্যক্রমের শুরু হয়। বর্তমানে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দীন।

বিজ্ঞাপন

তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করা ‘আকিজ বশির গ্রুপ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেখ বশির উদ্দিনের ভাই। অব্যবস্থাপনা, অবহেলার কারণে জরিমানাও গুনতে হয়েছে আদ্-দ্বীন হাসপাতালকে।

অলাভজনক দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করা হলেও গত ৪-৫ বছরে এখানে চিকিৎসার খরচ কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে সিজারিয়ান ডেলিভারি ৮-৯ হাজার টাকায় হতো, এখন তা ৩৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনরা।

স্বজন আমির হোসেন বলেন, আগে সিজারিয়ান ডেলিভারি করতে খরচ হতো ৬/৮ হাজার টাকা। আর এখন খরচ হয় ৩৫ হাজার টাকা। আমার স্ত্রীকে নরমাল ডেলিভারি করাবে বলে ভর্তি করিয়েছি। এখন বলে সম্ভব নয়। সিজার করতে হবে। এরপর যথারীতি ঔষধ, অপারেশন, সবমিলিয়ে বিলটা বেড়ে ৪০ হাজার টাকা।

বিজ্ঞাপন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে মারা যাওয়া এক শিশুর চাচা মতিউর রহমান বলেন, আগে জানতাম আদ্-দ্বীন মানবিক হসপাতাল। এখন সেবা নিতে এসে সেবার বদলে লাশ হয়ে ফিরছে শিশুরা।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মনোয়ার হোসেন অভিযোগ, চিকিৎসা পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা পর্যাপ্ত ও স্বচ্ছ তথ্য পাননি। শিশুদের অবস্থার অবনতি কেন ঘটল, কী ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল, কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর তারা পাননি বলে দাবি করেছেন।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, যখন একাধিক পরিবার একই ধরনের প্রশ্ন তোলে, তখন ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহেদ রায়হান বলেন, নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট এমন একটি অতি সংবেদনশীল চিকিৎসা পরিবেশ, যেখানে সামান্য ত্রুটি কিংবা সমন্বয়হীনতাও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। একসঙ্গে এতগুলো মৃত্যুর ঘটনায় আবেগ নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা প্রটোকল, জনবল ও তদারকি সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। এই ঘটনা দেশের হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, চিকিৎসা নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এখনো তদন্ত চলোমান। কোনো ছাড় নয়। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেবার দিক থেকে কোনো ত্রুটি আছে, অবশ্যই খতিয়ে দেখবো, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার আগে নিহত নবজাতকদের মায়েদের বক্তব্যও নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া হবে না। মন্ত্রী আরও জানান, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বাড়ানো হয়েছে যাতে কোনো তথ্য বাদ না পড়ে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্যও অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

বিজ্ঞাপন

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD