১৬ মাসে প্রাণ গেছে ৫২২ শিশুর, বাড়ছে শৈশবের অনিরাপত্তা

দেশজুড়ে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে শিশু হত্যা, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা। একের পর এক নৃশংসতায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৬ মাসে দেশে অন্তত ৫২২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরও ১ হাজার ২২৩ শিশু।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকাণ্ড নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো দেশকে। অভিযোগ রয়েছে, পাশের ফ্ল্যাটে থাকা এক দম্পতি তাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে। গত ১৯ মে পল্লবী সেকশন-১১ এলাকার একটি ভবন থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
শুধু রামিসাই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর নৃশংস সহিংসতার বহু ঘটনা সামনে এসেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করে হত্যা করতে চেয়েছিল তারই প্রতিবেশী। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। রাজধানীর বাড্ডায় তিন বছরের শিশু হাবিবকে হত্যা করেন তার নিজের বাবা। অভিযোগ রয়েছে, মাদক কেনার টাকা না পেয়ে সন্তানের গলা টিপে হত্যা করা হয়। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় গলা কেটে কিংবা পানিতে ফেলে শিশু হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে প্রতি মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। একই সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৭৬ জন শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, পারিবারিক অস্থিরতা এবং সহিংস মানসিকতা শিশুদের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশোধ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কিংবা অপরাধ আড়াল করতে শিশুরাই সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে পরিবারে পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা, অসহিষ্ণুতা ও দ্রুত বিত্তবান হওয়ার প্রবণতা। এসব কারণে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
নুসরাত সাবরিন চৌধুরী বলেন, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি গভীর মানসিক সংকটও তৈরি করে। এর ফলে শিশুর নিরাপত্তাবোধ, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার মতে, পরিবার, স্কুল ও সমাজ— সব জায়গায় সমন্বিত সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি আরও বলেন, অনেক শিশু ভয়, লজ্জা বা সামাজিক চাপে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে তারা নীরবে মানসিক যন্ত্রণা বহন করে। প্রযুক্তির অপব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবহার ও সহিংস কনটেন্টের সহজলভ্যতাও শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বড় একটি কারণ হয়ে উঠেছে মাদকাসক্তি। সম্প্রতি মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে শিশু অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে আপনজন কিংবা প্রতিবেশীর হাতেই প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরা।
বিজ্ঞাপন
তৌহিদুল হক বলেন, বড়দের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে শিশুরা প্রতিশোধের শিকার হচ্ছে। পারিবারিক সহিংসতা এবং মাদকাসক্তি শিশু হত্যার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেও এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
অভিভাবকদের মধ্যেও বাড়ছে আতঙ্ক। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে পড়ুয়া শিশুদের বাবা-মায়েরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তানদের একা কোথাও পাঠাতে ভয় লাগে। অনেকেই মনে করছেন, সমাজে মানুষের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে এবং শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
আরও পড়ুন: অনলাইন জুয়ার ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে তরুণ সমাজ
বিজ্ঞাপন
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদার করা, শিশুদের নিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া এবং সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
এলিনা খান বলেন, পারিবারিক সহিংসতা কমাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। একই সঙ্গে সমাজে নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা বাড়াতে হবে।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসেন বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সমাজের সব স্তরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।








