তিতাসের গ্যাস এখন ‘চাঁদের আলো’, চরম ভোগান্তিতে রাজধানীবাসী

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্যাস সংকট এখন নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, আর অনেক পরিবারকে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে শুধুমাত্র খাবার রান্নার জন্য। এতে কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে গৃহিণী—সবাই পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। পাশাপাশি বাড়ছে অতিরিক্ত খরচও।
বিজ্ঞাপন
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী সেলিনা হোসেন প্রতিদিনের এই দুর্ভোগের শিকার। সারাদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরে পরিবারের জন্য রান্না করতে গেলেও গ্যাসের স্বল্পচাপে তা সম্ভব হয় না। তার ভাষ্য, রাত ১২টার আগে চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ পাওয়া যায় না। ফলে ক্লান্ত শরীরে মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেই রান্না করতে হয়।
তিনি জানান, অনেক সময় ছুটির দিনেও দুপুরে রান্না করা যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে খেতে হয় পরিবারের সদস্যদের। এতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে মানসিক চাপও।
বিজ্ঞাপন
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মিরপুরের গৃহিণী হোসনে আরা। তিনি বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাসের চাপ এত কম থাকে যে রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। গভীর রাতে কিছুটা চাপ এলেও তখন নিয়মিত কাজ করা কঠিন হয়ে যায়।
শুধু মোহাম্মদপুর বা মিরপুর নয়, রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, বনশ্রী, মগবাজারসহ বহু এলাকায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাড্ডার বাসিন্দা মো. ফাহাদ বলেন, সন্ধ্যার সময়েও গ্যাস পাওয়া যায় না। ফলে পরিবারের খাবারের সময়সূচি পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে।
বর্তমানে আবাসিক দুই চুলার মাসিক গ্যাস বিল নির্ধারিত রয়েছে ১০৮০ টাকা। কিন্তু নিয়মিত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি ব্যবহার করছে। এতে মাসিক খরচ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে কয়েক হাজার টাকায়।
বিজ্ঞাপন
সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকা হলেও বাজারে তা কিনতে হচ্ছে ২১০০ থেকে ২২০০ টাকায়। ফলে পাইপলাইন গ্যাসের বিল দেওয়ার পরও আলাদা করে এলপিজি কিনতে গিয়ে গ্রাহকদের মাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে।
মিরপুরের বাসিন্দা জসীম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও গ্যাস আসে শুধু গভীর রাতে। এমন সেবা দিয়ে গ্রাহকদের হয়রানি ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২৭২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস থেকে আসছে ১৬৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ১০৫১ মিলিয়ন ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে উৎপাদন অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরে তা আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে দুটি এলএনজি টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করছে। তবে নতুন টার্মিনাল চালু হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারি অগ্রাধিকার তালিকায় বর্তমানে আবাসিক খাত নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে ঘাটতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।
তিতাস গ্যাসের আওতায় বর্তমানে প্রায় ২৮ লাখ আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। তবে সংকট বিবেচনায় সরকার ভবিষ্যতে আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে এলপিজি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। ইতোমধ্যে এলপিজি আমদানির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, গ্যাসের অপচয় কমাতে ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো বড় পরিসরে বাস্তবায়ন হয়নি।
তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি অবৈধ সংযোগও সংকটকে তীব্র করেছে। অভিযান পরিচালনা করেও পুরোপুরি অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে বৈধ গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় চাপ পাচ্ছেন না।
তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ ও সার খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ায় আবাসিকে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেনের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় আবাসিকে পুরোপুরি পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহ চালিয়ে যাওয়া কঠিন। তিনি বিকল্প হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন। তবে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে এলপিজিতে সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন তিনি।








