অথৈই জলে শত শত স্বপনের সলিল সমাধি

নদীকেন্দ্রিক দেশ হওয়ায় নৌপথ জনপ্রিয় বলে গণ্য আমাদের কাছে। বাণিজ্যিক কারণে অনেক আগে থেকেই এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটু সময় বেশি লাগলেও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা, প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগসহ নানা বিষয়। তবে বর্তমানে নৌপথ যেন মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান হলেও নৌ দুর্ঘটনার তীব্রতা অধিক।
বিজ্ঞাপন
এর মাতম অনেক। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌ দুর্ঘটনা নতুন বিষয় নয়। তাতে শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে; শত শত স্বপ্নের সলিল সমাধি ঘটছে। নদী তীরের আকাশ-বাতাস স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হচ্ছে।
প্রতিবারই নৌ দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর গুলো
তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের উঠে আসে অব্যবস্থাপনার নানা চিত্র আর তা হলো- মেয়াদ উত্তীর্ণ, লাইসেন্সবিহীন নৌ-যান, ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন, চালকের অদক্ষতা। আর যে বিষয়গুলো নজর এড়িয়ে যায়– মুনাফালোভী মালিকের গাফিলতি, নৌযান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদেহ উদ্ধার বা শনাক্ত করা গেলেও এ ক্ষেত্রে অনেক মৃতদেহ পানির নিচ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। চিরদিনের মতো তারা হারিয়ে যায়। শেষবারের মতো স্বজনরা দেখতে পায় না। সমাধিচিহ্ন পর্যন্ত থাকে না।
বিজ্ঞাপন
নৌ দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। একে অন্যকে না দুষে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণই দুর্ঘটনা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। নৌ পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রশাসনিকভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে। নৌ চালক, মাস্টার, বন্দর তত্ত্বাবধায়ক ও যান মালিকদের কর্মকাণ্ডও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সবিহীন চালক ও যানগুলো চিহ্নিত করে তাদের নৌপরিবহন সংক্রান্ত কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। আইন অমান্যকারীদের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহায়তায় আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।দেশে প্রায় ৬ হাজারের মতো নৌপথ রয়েছে। এদের বেশিরভাগই অরক্ষিত। এসব নৌপথে বৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার ছোট-বড় লঞ্চ, জাহাজ চললেও অনুমোদনহীনভাবে কয়েকগুণ বেশি নৌযান চলাচল করছে। এসব দেখার কেউ নেই।
নৌ-নিরাপত্তা সপ্তাহ শুরু আজ। স্বাধীনতার এত বছর পরও নদীমাতৃক বাংলাদেশে নিরাপদ করা যায়নি নৌপথকে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে যাত্রীবাহী নৌ পরিবহন ৫৩টি এবং মালবাহী নৌ পরিবহন ১১৮টি দুর্ঘটনার শিকার হয় এতে মোট ৩৯৮ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং আহত হন ২৯১ জন। অপরদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ৬ বছরে ৫২ যাত্রীবাহী নৌ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৮৬ জন এবং আহত হয়েছে ২৩ জন।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
বিজ্ঞাপন
২০২০ সালে ১১টি যাত্রীবাহী ও ১৪টি মালবাহী নৌযানসহ মোট ৩২টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় এ ঘটনায় ৮১ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয় এবং নিখোঁজ হন ১২ জন।
২০২১ সালে ৫টি যাত্রীবাহী ও ২০টি মালবাহী নৌযানসহ মোট ৩৯টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় এ ঘটনায় ১৪৬ জন নিহত ও ১৭৯ জন আহত হয় এবং নিখোঁজ হন ৩ জন।
২০২২ সালে ১০টি যাত্রীবাহী ও ১৭টি মালবাহী নৌযানসহ মোট ৩৬টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় এ ঘটনায় ১০৮ জন নিহত ও ৩৮ জন আহত হয় এবং নিখোঁজ হন ৮ জন।
বিজ্ঞাপন
২০২৩ সালে ৯টি যাত্রীবাহী ও ২৩টি মালবাহী নৌযানসহ মোট ৪২টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় এ ঘটনায় ২৯ জন নিহত ও ৩১ জন আহত হয় এবং নিখোঁজ হন ১৬জন।
২০২৪ সালে ৬টি যাত্রীবাহী ও ২১টি মালবাহী নৌযানসহ মোট ৩৭টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় এ ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হয় এবং নিখোঁজ হন ৮ জন।
২০২৫ সালে ১২টি যাত্রীবাহী ও ২৩টি মালবাহী নৌযানসহ মোট ৫২টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় এ ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয় এবং নিখোঁজ হন ২ জন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
২০২০ সালে ৪ যাত্রীবাহী নৌযান দুর্ঘটনা শিকার হয় এ ঘটনায় নিহত সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬ জন এবং আহত হন ২ জন।
২০২১ সালে ২ যাত্রীবাহী নৌযান দুর্ঘটনা শিকার হয় এ ঘটনায় নিহত সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১ জন এবং নিখোঁজ হন ৩০ জন।
বিজ্ঞাপন
২০২২ সালে ১ যাত্রীবাহী নৌযান দুর্ঘটনা শিকার হয়। এ ঘটনায় নিহতর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ জন।
২০২৩ সালে ১২ যাত্রীবাহী নৌযানসহ মোট ১৫টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহত সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ২২ জন ও আহত হন ১৫ জন এবং নিখোঁজ হন ৮ জন।
২০২৪ সালে ২০ যাত্রীবাহী নৌযানসহ মোট ২৯টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহত সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ জন ও আহত হন ৬ জন এবং নিখোঁজ হন ৫ জন।
বিজ্ঞাপন
২০২৫ সালে ১৩ যাত্রীবাহী নৌযানসহ মোট ১৫টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহত সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ জন এবং নিখোঁজ হন ১ জন।
এ দিকে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারাদেশে মোট ১ হাজার ৭৭০ নৌ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ১০৭ জন এবং আহত হয়েছে ৪৫৪ জন।
অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল আইন ২০১৯-এর ৬২ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, নৌযান ডুবি, অগ্নিকাণ্ড, সংঘর্ষ, বিস্ফোরণ ইত্যাদি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ও মোকাবিলার জন্য নির্ধারিত জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম সজ্জিত না হয়ে এবং অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষ এবং অন্যান্য দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া কোনও অভ্যন্তরীণ নৌযান বাণিজ্যিক উদ্দেশে বহন করা যাবে না।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. আলমগীর কবীর জনবাণীকে বলেন, অভ্যন্তরীণ নৌপথে নিরাপদ নৌ চলাচল বিশেষ করে যাত্রীবাহী নৌযান বা লঞ্চ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিআইডব্লিউটিএ বিভিন্ন নদী বন্দরে এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘাট সমূহে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এবং ট্রাফিক সুপারভাইজার নিয়োজিত করেছে। পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশন এবং সার্ভে সনদধারী অর্থাৎ ফিটনেস সম্পন্ন নৌ চলাচল নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করেছে। অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বোঝাইয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং আবহাওয়ার সংকেতসহ মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নৌ আদালতে মামলা দায়ের করে অপরাধীদের প্রয়োজনীয় শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে নৌপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানো ও জরিমানার ঘটনা ঘটলেও সচেতনতা বাড়ানোয় গুরুত্ব নেই সংশ্লিষ্টদের। দিনের পর দিন এভাবেই যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করছে তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও সঠিক তদারকির অভাবে নিশ্চিত হচ্ছে না নৌ নিরাপত্তা। পাশাপাশি বিদ্যমান আইনকে সময়োপযোগী করে ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের নৌপথকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশে মোট নৌপথের দৈর্ঘ্য ২৪ হাজার কি.মি. হলেও নৌপরিবহনযোগ্য নৌপথের দৈর্ঘ্য মাত্র ৫ হাজার ৯৬৮ কি.মি. তাও সেটি আবার শুষ্ক মৌসুমে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৬৫ কি.মি.। জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রবহমান নদী রয়েছে ৯৩১টি। নাব্যতা হারিয়েছে এমন নদীর সংখ্যা ৩০৮। তবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৮টি।
বিজ্ঞাপন
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমাদের নৌ পরিবহন ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। নৌ যোগাযোগ আমাদের দেশে সব সময় অবহেলিত হয়েছে। সড়ক পথে আমরা যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছি বিগত ২-৩ যুগে, এখন রেলপথে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে, নৌপথে আমাদের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমাদের নৌপথ প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট, একসময় নদীর ওপর আমাদের নির্ভরতা ছিল। সাশ্রয়ী, নিরাপদ, প্রযুক্তিনির্ভর করার ক্ষেত্রে যে ধরনের উদ্যোগ দরকার ছিল, কাঠামোগতভাবে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।’








