Logo

লুটপাটের স্মার্ট কৌশল প্রকৌশলী জিয়াউলের

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ মে, ২০২৬, ২০:৪২
লুটপাটের স্মার্ট কৌশল প্রকৌশলী জিয়াউলের
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের রাজত্ব চালাতে শাদাব সাজিদের হাত ধরে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)-এর স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান শেখ মো. জিয়াউল হাসান। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অকুলিন টেক বিডি লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দুর্নীতির রাজস্ব গড়ে তোলা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্প পরিচালক জিয়াউল হাসান শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির বন্ধু। সেই সূত্র ধরে ডিপিডিসিতে এক আধিপত্য তৈরি করা হয়েছে। সূত্র বলছে এই প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিল তুলতে সহযোগিতা করেছেন প্রকল্প পরিচালক। তবে কাজের নামে অকাজই হয়েছে এই প্রকল্পে। কিভাবে নামসর্বস্ব প্রকল্প নিয়ে তা বাস্তবায়ন দেখিয়ে অর্থ লুট করা যায়, সেই ধান্দায় ব্যস্ত থেকেছে প্রকল্প পরিচালক। মূলত এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রেহানা ও ববিসহ আওয়ামী ঘেষা অনেক মন্ত্রী-এমপি এবং আমলা তাদের দুর্নীতির টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। এবার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অকুলিনের প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সাগর চুরির ভয়াবহ চিত্র।

ডিপিডিসির এএমআই প্রকল্পে যতো অনিয়মঃ ডিপিডিসি প্রকল্পের শুরু থেকে ব্যাপক অনিয়ম হয় এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে গিয়ে। বিভিন্ন শর্ত জুড়ে টেন্ডার করা হয় যাতে শুধুমাত্র দুই দরপত্রদাতা অংশগ্রহণ করে। কথিত আছে এই দরপত্র অকুলিনেরই বানানো। নামসর্বস্ব এই টেন্ডারে অকুলিনই সর্বনিম্ম দরদাতা হয়। তাদের দাম ছিলো চারশত গুণ বেশি। পরবর্তীতে আবার বাজেট সংশোধন করে আবারো টেন্ডার করে অকুলিনকেই কাজ দেওয়া হয়।

এই ফাইল অনুমোদনের জন্য ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের চাপ দেন খোদ তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান। অনেকেই অস্বস্তিতে ছিলেন এই শ্বেতহস্তি প্রকল্পের ফাইল সই করতে। বারবার কমিটি বদল করা হয়। কিন্ত শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ অফিসার প্রধানমন্ত্রী অফিসের রেফারেন্সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রকল্পটি পাশ করতে বাধ্য হয়।

বিজ্ঞাপন

ডিপিডিসি মিটার প্রকল্পে ইউরোপীয়ান ল্যান্ডিস এন্ড গিয়ারের অত্যাধুনিক মিটার সরবরাহের কথা থাকলেও মিটার প্রস্তুত হয় চীনে। মিটার কমিউনিকেশনের নিক কার্ড সরবরাহ করা হয় ভারতের। পুরো প্রকল্প তদারকি করেছে ল্যান্ডিস এন্ড গিয়ারের কয়েকজন ভারতীয় প্রতিনিধি। তিনটি প্যাকেজে দরপত্র আহবান করা হয়। প্রতিটিতেই ঘুরে-ফিরে তিন কোম্পানির মিটার। দফায় দফায় প্রকল্পের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়।

এই প্রকল্পের সিস্টেম আজ অবধি অকার্যকর। মিটারগুলো পোস্টপেইড মিটারের মতো করে চলছে। এই প্রকল্পে সাড়ে ৮ লাখ প্রিপেইড মিটার প্রকল্প অকুলিন টেক প্রথম প্যাকেজ থেকেই কব্জায় করে নেয়। প্রকল্প পরিচালক মো. জিয়াউল হাসানের সহযোগিতায় অকুলিনের প্রভাবে মিটার প্রকল্পে যোগ হয় ডাটা সেন্টার। টেন্ডার দলিল প্রস্তুত হয় অকুলিনের প্রেসক্রিপশনে। উচ্চ মূল্যে মিটার, সিস্টেম, ডাটা সেন্টার, এমনকি মিটার প্রতি ওরাকল লাইসেন্স কেনা হয় অকুলিন থেকে। তিনটি প্যাকেজেই কাজ পায় মিটার কোম্পানী শেনঝেন স্টার ও ওয়াশিয়ন। এরপরের প্যাকেজগুলোতে পূর্বশর্ত দেওয়া হয়ে থাকে ডিপিডিসির সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত হতে হবে।

আদতে সেই সিস্টেম কার্যকরই হয়নি। অকুলিনের সরবরাহকৃত মিটার ডাটা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে আজ অবধি মিটার গুলো ঠিক ভাবে কাজ করছে না। বলা যায় অকার্যকর হয়ে আছে। এসকিউ ও অকুলিন টেকের ছায়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান ডিপিডিসির দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে বা কাজ পেতে নানা বাধার মধ্য পড়তে হয়। গ্রাহকেরা অভিযোগ করে আসছেন তাদের সরবরাহ করা মিটারে বিল বেশি আসে। মিটারগুলো স্মার্ট নয়। প্রায় হাজার কোটি বা তারও বেশি টাকা ব্যয়ের পরও কার্যত কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। নথিপত্র পর্যালোচনা করলেই চরম অনিয়মের বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন

শুধু এই দুটি সেক্টরেই নয়, অকুলিন টেক বিডি লিমিটেড যেখানেই কাজ করেছে, সেখানেই দুর্নীতি করেছে। দেশের টাকায় কেনা তাদের থেকে কেনা কোনো সিস্টেম কার্যকর হয়নি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কখনো ধরা পড়তে হয়নি তাদের। উল্টো তাদের দুর্নীতি ওপেন-সিক্রেট থাকলেও কেউ টু-শব্দ করার সাহস করেনি। কারণ, এর পেছনে ছিল স্বৈরাচার সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এই গজিয়ে ওঠা কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গা-ঢাকা দিয়েছেন। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদাব সাজিদ এবং চীফ টেকনিক্যাল অফিসার রুম্মান আক্তার দেশের বাইরে পলাতক। অকুলিন টেকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হাসান ইমাম বর্তমানে বাংলাদেশে থেক্র তাদের কার্যক্রমের কান্ডারি হিসেবে কার্যক্রম চালালেও দেশে না থাকার অভিনয় করছেন। প্রচুর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছাটাই করা হয়েছে। অনেককে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের জুনিয়র কিছু কর্মচারী এখন চুক্তিবদ্ধ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছে।

সরকারী বেশীরভাগ সংস্থা তাদের সাথে চুক্তি বাতিল করতে উদ্যোগ নিয়েছে। অনেকে যতোটুকু কাজ হয়েছে সেই পর্যন্ত বিল দিয়ে চুক্তির কার্যক্রম সম্পন্ন করতে চাইছে। কিন্তু প্রচ্ছন্ন চাপ, ক্ষমতা ও অর্থ প্রলোভন দিয়ে তাদের দমিয়ে রাখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে ওকুলিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব সাজিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ওকুলিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হামান ইমাম এর মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। বরং ক্ষুর্দে বার্তা পাঠিয়ে উত্তর মেলেনি।

প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. জিয়াউল হাসান বলেন, আমার সঙ্গে দেখা করেন। আমার বিরুদ্ধে নিউজ লিখে কি করবেন। আমি বিএনপির নেতা আমার মামা শশুর। আমার হাত অনেক লম্বা।

এবিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব থাকাই তাদের নির্মুল করা কঠিন।

বিজ্ঞাপন

আগামী পর্বে থাকছে অকুলিন টেকের দুর্নীতির নেপথ্যে প্রকল্প পরিচালক...

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD