ডিপিডিসি’র ভক্ষকদের রক্ষক এমডি নূর

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)— দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাটিতে একটি অসাধু চক্র বর্তমানে শক্ত ঘাটি গেড়ে বসেছে। যার ফলে সংস্থাটিকে মাঝেমধ্যেই প্রশাসনিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার আবর্তে নিমজ্জিত হতে হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ চক্র পরিকল্পিতভাবে ডিপিডিসিকে কুক্ষীগত করে নিজেদের রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নেতৃত্বে নিচ্ছেন ডিপিডিসি’র ব্যবস্থাপনা (এমডি) পরিচালক নূর আহমদ।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন এক প্রকৌশলী। অভিযোগে বলা হয়, সংবাদকর্মীরা প্রতিবেদন প্রকাশ করায় যেন গোস্যা করেছেন খোদ ডিপিডিসিরই নীতিনির্ধারনী মহল। আর এ কারনে ইতোমধ্যেই সংস্থাটির এইচআর বিভাগ থেকে গত ২০ এপ্রিল জারি করা হয়েছে সার্কুলার। যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন। এ সার্কুলার জাারিতে কেউ বলছেন ডিপিডিসিতে একটি চক্র দুর্নীতিবাজদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছে। কেউবা বলছেন, এ যেন চোরের মায়ের বড় গলা। আবার কেউ কেউ বলছেন, প্রকৃত ঘটনা আড়াল অর্থাৎ দুর্নীতিবাজদের রক্ষায় কিংবা নিজেদের দায়মুক্তি নিতেই এই সার্কুলার জারি।
অনুসন্ধান ও নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, ডিপিডিসিতে ঘাপটি মারা এই বিশেষ চক্রটি বিভিন্ন পন্থায় সংস্থার মধ্যে তাদের আধিপত্য বিস্তারের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে এই চক্রটি পাওয়ার সেক্টর বিষয়ক ফেইসবুক আইডি খুলে তা দিয়ে নানা নেতীবাচক প্রপাগান্ডা ছড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। দুর্নীতি বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করায় এর মাধ্যমে সংবাদ কর্মীদের নিয়ে মনগড়া বিষোদগার করা হচ্ছে। এমনকি এই চক্রের মনপুত না হওয়ায় বিদ্যুৎ সচিবের বিরুদ্ধেও উস্কানীমূলক ও কুরুচিপূর্ন মন্তব্য এ পেইজটিতে প্রচার করা হয়েছে।
ফেইসবুকে প্রচারনাকারী এ পেইজের পরিচালনার সাথে ডিপিডিসি’র নীতিনির্ধারনী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার পাশাপাশি সংস্থার একটি শ্রমিক সংগঠনের কথিত দুই জন নেতা জড়িত বলে জানা গেছে। এছাড়া বিষয়টি জানেন দুর্নীতিবাজ কতিপয় নির্বাহী ও তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। এদের সকলেরই মিশন একÑই অর্থাৎ নিজেদের রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিল।
বিজ্ঞাপন
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ডিপিডিসিতে কতিপয় দুর্নীতিবাজ রয়েছেন এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই সার্কুলার জারি না করে সংস্থাটিতে কর্তৃপক্ষের শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা উচিত ছিল। সার্কুলার জারি করে তারা নিজেরাই নিজেদের বিতর্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রকৌশলী জানান, বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের আমলে যে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানাভাবে হয়রানী ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তারা সেই পরিস্থিতি থেকে এখনো অনেকেই পরিত্রান পাননি। এখন তাদের ভিন্নভাবে হয়রানী করা করা হচ্ছে। ডিপিডিসিতে তাদেরকে রাখা হচ্ছে কোনঠাঁসা করে। আর বহাল তবিয়তে এখনো ডিপিডিসি’র মোক্ষম স্থানে পোষ্টিং নিচ্ছেন ফ্যাসিষ্ট আমলের সেই সুবিধাভোগীরা আর এক ধরনের শাস্তিমূলক স্থানে পোষ্টিং দেয়া হচ্ছে ত্যাগী ও নিবেদিত প্রকৌশলীদের।
এ সবই পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করছে বিশেষ রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের চক্রটি। এ চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন সংস্থাটির নীতি নীতিনির্ধারনী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। ঘাপটি মেরে থাকা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের এসব কর্মকর্তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে সূত্রের দাবি। তারা সংস্থার স্বার্থ না ভেবে নিজেদের মতাদর্শের বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদস্থ করে একচ্ছত্রভাবে ডিপিডিসিকে নিয়ন্ত্রণের নীল নকশা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, খোদ বিদ্যুৎ সচিবের বিরুদ্ধে উস্কানীমূলক ও কুরুচিপূর্ন প্রচারনা ফেইসবুকে চালানো হলেও ডিপিডিসি থেকে এ ব্যাপারে কঠোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে সংস্থাটি কার্যকর তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অথচ সাংবাদিকেরা সংস্থাটিতে অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় কতিপয়ের গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। জারি করা হয়েছে সার্কুলার। ডিপিডিসি থেকে জারিকৃত এই সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ডিপিডিসির কোনো এমপ্লয়ী (কর্মকর্তা-কর্মচারী) চাকরীবিধির ৭.২ (বি) রোমান তিন এর অথবা রাষ্টীয় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অযাতিত তথ্য বিভিন্ন মিডিয়ায় দেয়ার ব্যাপারে জড়িত হলে সংশ্লিষ্ট এমপ্লয়ীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ও রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।’
বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জনভোগান্তী বাড়াবে এমন কোনো ব্যাক্তি অথবা সিন্ডিকেটকে বর্তমান সরকার বরদাশত করবে না। এ জাতীয় সিন্ডিকেটকে আমরা স্ব-মূলে নির্মূল করে ফেলবো।
তিনি বলেন, ব্যাক্তি বা দলীয় স্বার্থ হাসিলে কোন ব্যাক্তি, গোষ্ঠী বা চক্র যদি প্রতিষ্ঠান অথবা সংস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা করে তাহলে তাদেরকে কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ডিপিডিসির মতো একটি সংবেদনশীল ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানে যদি যোগ্য নেতৃত্বের অভাব থাকে এবং তা যদি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর চারণভূমিতে পরিণত হয়, তবে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ গ্রাহক ও জাতীয় গ্রিডের ওপর পড়বে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনতিবিলম্বে বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ন্যায় পরায়ন ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের পদায়ন না করলে ডিপিডিসির প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। কেবল বাস্তবমুখী নীতিমালা এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনই পারে ডিপিডিসিকে এই ‘জগাখিচুড়ি’ অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে।








