জ্বালানি সংকটে বন্ধ ১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র, চরম দুর্ভোগে গ্রামাঞ্চল

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাড়ছে লোডশেডিং, যার বড় ধাক্কা পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। বর্তমানে দৈনিক গড় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মতো। ফলে প্রতিদিনই ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং আমদানি নির্ভর জ্বালানির সরবরাহে বিঘ্নের কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতেই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়া এবং কয়লার উচ্চমূল্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে দেশে থাকা ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে এর বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। জ্বালানি সংকটের কারণে ইতোমধ্যে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, যার মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ১০টি এবং তেলভিত্তিক ৮টি কেন্দ্র রয়েছে। পাশাপাশি আরও ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে গেছে।
বিজ্ঞাপন
পরিসংখ্যান বলছে, ১৮ এপ্রিল দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ছিল। দিনের বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ওঠানামা করেছে, কখনো তা ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে, আবার কখনো ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে। সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও চাপের মধ্যে পড়ে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের চিত্র ভিন্ন হলেও ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি কঠিন। একদিনে মোট লোডশেডিংয়ের বড় অংশই হয়েছে গ্রামাঞ্চলে, যা নগর এলাকার তুলনায় অনেক বেশি।
গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। অনেক এলাকায় দিনে ৬ থেকে ৮ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, ফলে গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি কৃষিকাজ এবং ক্ষুদ্র শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
রংপুরের এক বাসিন্দা জানান, দিনের বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন রাজশাহীর বাসিন্দারাও। রাতের সময় লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ছে, বিশেষ করে গরমের মধ্যে ঘুমাতে কষ্ট হচ্ছে।
অন্যদিকে শহরাঞ্চলে লোডশেডিং তুলনামূলক কম হলেও তা পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না। সামনে এসএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের মধ্যে পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে। ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হলেও পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি সাশ্রয়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক জায়গায় মানা হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ কমানো সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল হওয়ায় তা সীমিত রাখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখনো চাপে রয়েছে। সামনে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এজন্য বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন বিশেষজ্ঞরা।








