নম্বর প্লেটেই দামের বিস্ফোরণ, ৬ লাখের সিএনজি এখন ২৫ লাখ

ঢাকার সড়কে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার বাজারে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। যেখানে একটি নতুন সিএনজি কিনতে খরচ হওয়ার কথা প্রায় ৬ লাখ টাকা, সেখানে সেটিকে রাস্তায় নামাতে মোট ব্যয় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকায়। মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে নম্বর প্লেট বা নিবন্ধন সংকটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শোরুমে একটি সিএনজি অটোরিকশার দাম ৫ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকার মধ্যে। সরকারি কাগজপত্র সম্পন্ন করতে লাগে আরও প্রায় ১২ হাজার ৪৩৯ টাকা। কিন্তু বাস্তবে এই খরচের সঙ্গে যোগ হচ্ছে দালাল, মালিক ও প্রভাবশালী মহলের অবৈধ লেনদেন—যার ফলে কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে মোট ব্যয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একটি সিএনজি অটোরিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ১৫ বছর। এই সময় শেষ হলে একই মালিককে ‘রিপ্লেসমেন্ট’ সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে নতুন করে নিবন্ধন পাওয়ার সুযোগ প্রায় বন্ধ। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই পুরোনো নম্বর প্লেটের কালোবাজার তৈরি হয়েছে। একটি পুরোনো নম্বর কিনতে দালালদের মাধ্যমে গুনতে হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে পুরোনো গাড়ির মালিককে দিতে হয় আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে একটি নতুন সিএনজি রাস্তায় তুলতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ঢাকায় প্রায় ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা নামানো হয়। পরে আরও ২ হাজার ৬৯৬টি যুক্ত হয়। বর্তমানে বৈধভাবে চলমান সিএনজির সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৯৬টি। যদিও বিআরটিএর হিসাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট নিবন্ধিত সিএনজির সংখ্যা ২০ হাজার ৯৯৫টি। কিন্তু গত পাঁচ বছরে নতুন নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ৪৪৫টি, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সীমিত সরবরাহের কারণেই সিএনজি এখন ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয়েছে। একবার কেউ একটি সিএনজি কিনতে পারলে তা থেকে নিয়মিত আয় সম্ভব। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে নতুন ক্রেতাদের পাড়ি দিতে হয় জটিল প্রক্রিয়া ও অবৈধ লেনদেনের ধাপ।
চালকদের অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়ায় দালালদের একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয়। তারা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই অর্থ নেয়। নতুন নিবন্ধন বন্ধ থাকায় পুরোনো নম্বর প্লেটই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
বিজ্ঞাপন
খাত বিশ্লেষকরা জানান, বর্তমানে ঢাকার প্রায় ১৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশার মালিকানা সীমিত সংখ্যক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। প্রায় এক হাজার মালিক নিয়ন্ত্রণ করছেন ৫০ হাজারের মতো চালককে। প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ যাত্রী এই সেবার ওপর নির্ভরশীল হলেও, চালকদের অধিকাংশেরই কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র নেই—যা যাত্রীসেবায় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
সিএনজি মালিকদের মতে, বাজারে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই খাত। পুরোনো নিবন্ধন কিনে উচ্চ দামে সিএনজি পরিচালনা করছেন অনেকেই। ফলে সাধারণ চালক বা নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এই ব্যবসায় প্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল জায়গা হলো নিবন্ধন নীতির সীমাবদ্ধতা। নতুন নিবন্ধন উন্মুক্ত না থাকলে এই অস্থিরতা কমবে না। একই সঙ্গে সড়কের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে সিএনজির সংখ্যা বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরের সম্প্রসারিত এলাকাগুলোর চাহিদা বিবেচনায় নতুন করে এক হাজার সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়ার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এই খাতে সিলিং রয়েছে ১৫ হাজার ৬৯৬টি যানবাহনের ওপর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিবন্ধন নীতিতে পরিবর্তন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং সিন্ডিকেট ভাঙার কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সিএনজি খাতে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও অস্থিরতা আরও বাড়বে। পাশাপাশি সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব হারাতে থাকবে, যা সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।








