Logo

৯ বছর আগে নথি চুরি খোঁজ নেয়নি রাজউক

profile picture
মো. রুবেল হোসেন
৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১৩:৫০
৯ বছর আগে নথি চুরি  খোঁজ নেয়নি রাজউক
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নথি গায়েবের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগেও অনেকবার গ্রাহকের নথি গায়েব হয়েছে রাজউক থেকে। কিন্তু কেন, কীভাবে, কারা এসব নথি গায়েব করেছিল সেসবের কোনো সুরাহা হয়নি কখনো। এবারও যে নথি গায়েবের ঘটনার কোনো কূলকিনারা হবে তেমনটি দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন জোন-৩/১ বর্তমানে জোন-৪ এর অফিস থেকে ২০১৭ সালের ১৪ মার্চ ভবন নির্মাণের অনুমোদন ফাইল নিয়ে যায় রাজউকের সহকারী অথরাইজ অফিসার আব্দুল সাত্তার। এ ঘটনার কয়েক বছর পরই রাজউকের সহকারী অথরাইজ অফিসার আব্দুস সাত্তার অবসরে চলে জান, কিন্তু রাজউকের ভবন নির্মাণের অনুমোদন ফাইলটি আর ফিরে আসেনি মহাখালীতে অবস্থিত রাজউকের জোন-৪ এর অফিসে। জমির মালিক নাসিম হোসেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর মৌজায় ৭তলা ভবন নির্মাণের নক্সা অনুমোদনের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক ২০১৬ সালের ২ মার্চ অনুমোদন দেয়।

নিয়ম অনুযায়ী ভবন নির্মাণ অনুমোদনের পর ফাইলটি রাজউকের সংশ্লিষ্ট জোনে সংরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু ৩ বছর আগে রাজউকের সহকারী অথরাইজ অফিসার আব্দুস সাত্তার (বর্তমানে অবসরে) নিয়মের ব্যর্থই ঘটিয়ে ফাইলটি নিজ বাসায় নিয়ে যায় এরপর থেকে এই ফাইলের আর কোন হদিস পায়নি রাজউক। সরকারি দপ্তরের ফাইল রাজউকের এই কর্মকর্তা কিভাবে বাসায় নিয়ে যায় এটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক সহকারী অথরাইজ অফিসার আব্দুস সাত্তারের সাথে যোগাযোগ করার জন্য তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে কল দিলে তিনি রিসিভ করেন নি।

বিজ্ঞাপন

এর আগে ২০১৯ সালের মে মাস থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সার্ভার থেকে ভবন নির্মাণের অনুমোদন সংক্রান্ত প্রায় ৩০ হাজার গ্রাহকের আবেদনের নথিপত্র গায়েব হওয়ার ঘটনায় ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন আদালত। যদিও ২০২৩ সালে গায়ের হওয়ার নথির মধ্য থেকে ২৬ হাজার ৭৭৭ নথি উদ্ধার করে রাজউক।

ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারণা শুরু হয় পাকিস্তান আমলে। ১৯৫৬ সালে গঠিত হয় ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি), যা ছিল ঢাকার প্রথম আধুনিক নগর পরিকল্পনা সংস্থা। এর কাজ ছিল নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন। ডিআইটির সময়েই গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে।

১৯৮৭ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ডিআইটিকে পুনর্গঠন করে রাজউক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মাধ্যমে সংস্থাটির ক্ষমতা ও কার্যপরিধি আরও বিস্তৃত হয়। রাজউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকার সার্বিক নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পায়। এর মধ্যে রয়েছে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো পরিকল্পনা। বর্তমানে রাজউক ঢাকার দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ ও অবৈধ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।

বিজ্ঞাপন

বাড়ির নকশা অনুমোদন এমন প্রক্রিয়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, মোটা অংকের ঘুস ছাড়া এ কাজ প্রায় অসম্ভব। ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজউকের ঘুস-দুর্নীতি নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ফলাফলে দেখা গেছে, ইমারতের নকশা অনুমোদনের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কর্মকর্তাদের ৫০ হাজার টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুস দিতে হয়। এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধের জন্য ২০২২ সালে ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম (ইসিএসপি) নামে অনলাইন সেবা চালু করেছিল রাজউক। বাড়ির নকশা অনুমোদনে ইচ্ছুক ব্যক্তি সাইটে জমির পরচা, খাজনার রসিদ, এনআইডি ইত্যাদি দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে ছাড়পত্র নিতে হয়। তবে ওয়েবসাইট শুধু নামেই। সব কাজ টেবিলে টেবিলেই হয়।

জানা যায়, রাজউকের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে রাজধানীর বড় অংশই গড়ে উঠেছে বিপজ্জনক নগরী হিসেবে। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, বছিলা, কেরানীগঞ্জ, রুহিতপুর, ডেমরা, চিটাগং রোড, রূপগঞ্জের মতো এলাকার ভবন মালিকরা রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ভবন তুলে ফেলছেন। বেশির ভাগ ভবন মালিকই অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকদের যোগসাজশে এসব করছেন বলে খাতসংশ্লিষ্টরা অভিযোগ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে সরকারি নথি চুরি বা চুরির চেষ্টা করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ, যা দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩৭৯ ধারা এবং অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩-এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকারি নথি চুরির অপরাধে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। অনুমোদিত ছাড়া ফাইলের ছবি তোলা বা নথিপত্র নিজের দখলে রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি দপ্তরের কোন নথি হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে তা থানায় সাধারণ ডাইরি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে কিন্তু গত ৩ বছর আগে রাজউকের এই গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরি হওয়ার পরও নিরব ভূমিকা পালন করছে রাজউক কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

রাজউক চেয়ারম্যান ইন্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম দৈনিক জনবাণী কে বলেন, রাজউকের সাবেক সহকারী অথরাইজ অফিসার আব্দুস সাত্তার কেন অফিসিয়াল ফাইল ব্যক্তিগতভাবে নিজের নিকট রেখেছে তা খতিয়ে দেখে, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD