Logo

যুদ্ধের প্রভাবে দিশেহারা জ্বালানি খাত, ভর্তুকির চাপে দেশের অর্থনীতি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১৯:২০
যুদ্ধের প্রভাবে দিশেহারা জ্বালানি খাত, ভর্তুকির চাপে দেশের অর্থনীতি
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। বিশেষ করে ডিজেল ও অকটেন—যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান—এই খাতে আমদানিনির্ভরতার কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু এই দুই জ্বালানিতেই সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে ব্যবহৃত ডিজেলের প্রায় শতভাগ এবং অকটেনের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে তেল কিনে দেশে তুলনামূলক কম দামে সরবরাহ করতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরকার ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এই ভর্তুকির বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠেছে।

দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও বিপণনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বর্তমানে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়। গত কয়েক বছরে তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় বিপিসি ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করেছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৪ হাজার ২১৬ কোটি টাকা লাভ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাদের নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল এবং পরিশোধিত জ্বালানি—যেমন ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন—আমদানিতে বড় অংশ ব্যয় হয়েছে।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বৈশ্বিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম যুদ্ধের আগে ব্যারেলপ্রতি ৬৭ ডলার থাকলেও তা এখন বেড়ে ১০৮ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

এই বাড়তি দামের প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমদানিতে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে খরচ হচ্ছে ২০৩ টাকার বেশি, অথচ দেশে তা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। ফলে প্রতি লিটারে ১০৩ টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে বিপিসিকে। একইভাবে অকটেনেও প্রতি লিটারে ৩১ টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিসি প্রায় ২৪ লাখ টন ডিজেল এবং ২ লাখের বেশি টন অকটেন বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমান মূল্য কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে এই সময়ের মধ্যে শুধু ডিজেলেই প্রায় ২৯ হাজার ৬১২ কোটি টাকা এবং অকটেনে ৯৪৯ কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির প্রয়োজন দাঁড়াবে ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

এদিকে সরকার এখনই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের ওপর বাড়তি চাপ এড়াতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, যার পরিমাণ প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা।

তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে মূল্য সমন্বয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভর্তুকির মাধ্যমে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া সরকারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কীভাবে এই চাপ সামাল দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD