Logo

এনআরবিসি ব্যাংকে সক্রিয় সংঘবদ্ধ আওয়ামী চক্র

profile picture
মো. রুবেল হোসেন
৩১ মার্চ, ২০২৬, ১৫:০৫
এনআরবিসি ব্যাংকে সক্রিয় সংঘবদ্ধ আওয়ামী চক্র
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

এনআরবিসি ব্যাংকের নির্যাতিত কিছু পরিচালকদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, এনআরবিসি ব্যাংকের অনিয়ম ও লুটপাটের জন্য যেসব পরিচালক ও ব্যাবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সদস্যদের বিরুদ্ধে তারা এতদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জানিয়ে এসেছিলেন এবং যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সাল থেকে শুরু করে এযাবৎ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অপরাধী চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার কথা বলে এসেছিল।

বিজ্ঞাপন

এবার নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত আন্তর্জাতিক ফরেনসিক অডিটের (কেপিএমজি) প্রতিবেদনেও সেই একই সংগবদ্ধ (পর্ষদ ও ব্যাবস্থাপনা কতৃপক্ষের মহাদুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত) ব্যাংক লুটেরা দানবীয় চক্রের নাম এসেছে। কিন্তু এবারও সেই একই অজানা কারণে একপ্রকার নীরব ভূমিকা পালন করছে ব্যাংকটির বর্তমান স্বাধীন পর্ষদ। যদিও ব্যাংকটির দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানকারী, তমাল চক্র দ্বারা নির্যাতিত গুটিকয়েক সৎ ও পেশাদার ব্যাংকারদের গণ-আন্দোলন ও কঠোর আত্মত্যাগের কারণেই সেসময় বাংলাদেশ ব্যাংক সুশাসনের নিমিত্তে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র পর্ষদ গঠন করে দেয়। তথাপিও সেই স্বতন্ত্র পর্ষদ বিভিন্ন কারণে ও সময় ক্ষেপনের ধীরে চল নীতির কারণে বরাবরের মতোই উপেক্ষিত প্রকৃত দায়ী ও চিহ্নিত অপরাধী পরিচালক ও তাদের সহযোগী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিচার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য দুর্নীতির মাধ্যমে তৎকালীন স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু মহাদুর্নীতিবাজ ব্যাক্তিদের মদদে শুধুমাত্র অনিয়ম, লুটপাট ও দেশের টাকা পাচারের জন্যই ২০১৩ সালের রাজনৈতিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারাসাত আলী ও আরেক মহাদুর্নীতিবাজ বর্তমান সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি তৌফিক রহমান চৌধুরীর ব্যাংক লুটের নিখুঁত পরিকল্পনায় ব্যাংকটির অনুমোদন নিয়েছিলো। যার ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠার ৩ বছরের মধ্যেই ব্যাংকটির প্রায় ৯০০ কোটি টাকা লুটপাটের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে ২০১৭ সালেই বাংলাদেশ ব্যাংক কতৃক ফারাসাত আলী ও তৌফিক চৌধুরীকে এবং তাদের দোসর অন্যান্য পরিচালকদের ব্যাংকটি থেকে অপসারণ করা হয়। ব্যাংকটিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্যাংকটির অনুমোদনের সময় উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে প্রিমিয়ামের নাম করে চাঁদা আদায় করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দুর্নীতিবাজ ফারাসাত আলী, তৌফিক চৌধুরী শেখ সেলিম ও শেখ তাপসকে দেয়।

এরপর এই একই চক্রকে আরও বেশি টাকা ও নানামুখী কায়দায় ব্যাংকটি লুট করার সুযোগ দেয়ার শর্তে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটি দখলে নেয় আওয়ামী ভুঁইফোড় নেতা দানবীয় পারভেজ তমাল, আরজু মিয়া ও আদনান ইমাম চক্র। আর এই চক্রের হাতে আসার পর ব্যাংকটির দুর্নীতি ও নৈরাজ্যের নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। এবং এর সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক দুই গভর্নর ফজলে কবির ও রউফ তালুকদার প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে যায় আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাগুলো দুর্নীতিলব্ধ অর্থের এক আলাদিনের চেরাগ হিসেবে ব্যাংকটিকে ব্যবহার করে।

বিজ্ঞাপন

এসব আওয়ামী দুর্বৃত্তের বলয়ে ব্যাংক লুটের নিখুঁত পরিকল্পনায় আরেক রাজনৈতিক বিবেচনার ব্যাংক মার্কেন্টাইল ব্যাংকের লুটেরা সিন্ডিকেটের ব্যাবস্থাপনা কতৃপক্ষের লোকদেরকে এখানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ ও ব্যাংক লুটের মাস্টারমাইন্ড তৌফিক চৌধুরী ও শহিদুল আহসানের প্রতক্ষ ব্যাবস্থাপনায় এই ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনায় সংযুক্ত করা হয়, যাদের বিষয়ে কার্যত কোনো পদক্ষেপই নেয়নি কেউ। যে কারণে এই ব্যাংকের নৈরাজ্য, লুটপাট বন্ধ ও সুশাসন কোনোদিনও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে পর্ষদ প্রতিটি ক্ষেত্রে পদে পদে ব্যর্থতা ও আমলাতান্ত্রিকতার পরিচয় দিয়েই যাচ্ছে। যে কারণে বিগত একবছরে কাঙ্খিত কোনো সংস্কার বা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনোপ্রকার শাস্তির ব্যবস্থা তো হচ্ছেই না উপরুন্ত পূর্বের দুর্নীতিবাজ চক্র আবারও তাদের দোসর মহাদুর্নীতিবাজ ও লুটেরা কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় মিলে-মিশে ব্যাংক লুটপাটের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিশেষভাবে মরিয়া।

ব্যাংকটির পরিচালক যাদের নাম আন্তর্জাতিক ফরেনসিক অডিট সংস্থার (কেপিএমজি) প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে তারা হল: ১) সাবেক চেয়ারম্যান তমাল পারভেজ, ২) ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মিয়া আরজু, ৩) সাবেক ইসি চেয়ারম্যান আদনান ইমাম, ৪) ফারাসাত আলী, ৫) সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান তৌফিক রহমান চৌধুরী, ৬) সাইদুর রহমান, ৭) মোহাম্মদ আলী মামুন, ৮) লোকিয়াতুল্লাহ, ৯) মোহাম্মদ নাজিম/নাজিম মিয়া, ১০) ওলিউর রহমান, ১১) মোস্তাফিজুর রহমান, ১২) শফিকুল আলম মিঠুনসহ বেশ কয়েকজন।

এ খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, কেপিএমজি'র প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এইসব কুশীলবদের দুর্নীতি, কুকর্ম ও অপকীর্তি কিন্তু বর্তমান পর্ষদ ও ব্যাবস্থাপনা কতৃপক্ষের নীরবতায় এখনও এরা সকল প্রকার ধরাছোয়ার বাইরেই আছে। আর ব্যাবস্থাপনা লেভেলের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তাদেরও তমাল-তৌফিক-আদনান চক্রের যোগসাজশে এসব কুকর্ম এখনো বীরদর্পে চলছে। যার সকল ব্যর্থতার দায় বর্তমান পর্ষদের কারণ বর্তমান পর্ষদ তাদের অপকর্মের কথা জেনেও শাস্তির পরিবর্তে নীরবে তাদেরকে এক স্থান থেকে আরেকটি সুবিধাজনক স্থানে পদায়ন দিয়ে নির্বিঘ্নে চাকুরী করার সুযোগ দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক ফরেনসিক অডিট সংস্থার (কেপিএমজি) প্রতিবেদনে আরও যেসব কর্মকর্তার নাম প্রকাশ পেয়েছে, যারা হল: ১) ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি হারুনুর রশিদ, ২) এসইভিপি সাফায়েত কবির কানন, কবির হোসেন, হাফিজ ইমরোজ মাহমুদ, ৩) ইভিপি মইনুল হোসেন কবির ও দেলোয়ার হোসেন, ৪) এসভিপি কমান্ডার ফরহাদ সরকার (হেড অফ টর্চার সেল), পারভেজ হাসান, জাফর ইকবাল হাওলাদার, আব্দুল গফুর রানা, মারুফ উদ্দিন কামাল, দিদারুল হক মিয়া, রাজিদুল ইসলাম, আহসান হাবিব (রউফ তালুকদারের আত্মীয়), মশিউর রহমান, ৫) ভিপি মোকলেসুর রহমান, এসকেএস-মাইক্রো লুটেরা রমজান আলী, ৬) জামির উদ্দিন, আসিফ ইকবাল, শাকিল আহমেদ, আসিফ আহমেদ, ক্যাপ্টেন মেহমুদ অভি ও কামরুল হাসানসহ অর্ধশতকেরও বেশি ব্যাংক কর্মকর্তা ব্যাংকটি লুটের দায়ে ব্যাপকভাবে অভিযুক্ত, চিহ্নিত ও প্রমাণিত হয়েছে যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টেও এসেছে।

নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক এসব ঘটনা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে বিরল যা নিয়ে শুরু থেকেই ধারাবাহিক ভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসেছে দৈনিক জনবাণী।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা জানান, সাধারণ, বিনিয়োগকারী, আমানতকারীদের স্বার্থে ও প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক ও কেপিএমজির তদন্তে উঠে আসা এসব দায়ী, দাগি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও পরিচালকদেরকে অবিলম্বে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা ও তাদেরকে অবিলম্বে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর থেকে আজবনের জন্য নিষিদ্ধ করার যে সুপারিশ উঠেছে সেটি বাস্তবায়নের জন্য নতুন সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভুগি ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা এবং নতুন সরকারকেই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা। এ প্রসঙ্গে, এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলী হোসেন প্রধানীয়া মুঠোফোনে দৈনিক জনবাণীকে বলেন, আন্তর্জাতিক ফরেনসিক অডিট সংস্থার (কেপিএমজি) প্রতিবেদনের আলোকে আমরা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD