সরকারি গুদামকে নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানিয়েছেন দিনা

শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া এলএসডি (খাদ্য গুদাম) ঘিরে একের পর এক দুর্নীতি, অনিয়ম ও চেক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ আলম (দিনা) তার নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুদামকে গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি একটি লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু সেই তদন্ত কমিটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গুদাম সংশ্লিষ্টরা। স্বচ্ছ তদন্তের ব্যপারে আঞ্চলিক খাদ্য নিযন্ত্রক (আরসি ফুড)’র আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া বাজারের ব্যবসায়ী খান রাইস মিলের মালিক মতিউর রহমান খানের লিখিত অভিযোগ থেকে জানাযায়, ২০২৫-২৬ খ্রি: অর্থ বছারে আংগারিয়া এলএসডিতে আমন চাল সংগ্রহ অভিযানের তার মালিকানাধীন খান রাইস মিলের নামে চাল সংগ্রহ দেখিয়ে শরীযতপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হুমায়ুন কবির ও শরীয়তপুর সদর উপজেরা আংগারিয়া এলএসডির (খাদ্য গুদামের) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়ান আলম (দিনা) সরকাররের কয়েক লক্ষ টাকা অত্মসাৎ করেছেন। ১২ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে মিলের মালিক মতিউর রহমান খানের সোনালী ব্যাংক শরীয়তপুর শাখার হিসাব নাম্বার থেকে দেয়া একটি ম্যাসেজের মাধ্যমে তিনি জানাতে পারেন তার হিসাবে নাম্বার থেকে একটি চেক ইস্যু করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
পরে তিনি সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করে তিনি জানাতে পারেন, তার হারিয়ে যাওয়া একটি চেকের (হারানো চেকের জিডি নাম্বার পালং মডেল থানা ৯৭০) মাধ্যমে শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ আলম (দিনা) তার লোক দিয়ে টাকা উত্তোলন করেছেন। আমাকে ফোন না দিয়ে বা অনুমতি না নিয়ে কেন চেকের টাকা প্রদান করা হয়েছে সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার এমন প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেনি বলে লিখিত অভিযোগে দাবী করেছেন মাতিউর রহমান খান।
লিখিত অভিযোগে খান রাইস মিলের মালিক মতিউর রহমান খার আরও উল্লেখ করেছেন, শরীযতপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হুমায়ুন কবির ও শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়ান আলম (দিনা) যোগসাজস করে তার অজান্তে তার সহি স্বাক্ষর নকল করে খান রাইস মিলের নামে পে-অর্ডার করেছে। টিআর কাবিখার চাল কিনে তা দিয়ে সংগ্রহ সমন্বয় করেছে। আবেদনের অনুলিপি সংবাদিকদের মাঝে বিতরণ করে ন্যায় বিচার দাবী করেন মতিউর রহমান খান।
বিজ্ঞাপন
এর কয়েকদিন পরে স্থানীয় এক প্রভাবশালী বিএনপির নেতার মাধ্যমে খান রাইস মিলের মালিক মতিউর রহমান খান এর সাথে টাকার বিনিময়ে সমোঝতার একটি অডিও স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে ছড়িয়ে পরে। যাতে পুরো ঘটনা স্বীকার করে ধান ও চাল সংগ্রহের লাভের টাকার ভাগবাটোয়ারা করতে শুনা যায়। অডিওতে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বলতে শুনা যায়, তার তো (মতিউর রহমান খার) মিলই নাই। এরপর গুদামের এক ষ্টাফ ওই মিমাংশা করতে আসা নেতাকে বিষয়টি মিমাংশা করে দেয়ার অনুরোধ করেন। তাদের অনুরোধে ওই নেতা কিভাবে মিমাংশা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেন। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকে গিয়ে মতিউর রহমান খান কে ওই চেকে স্বাক্ষর করে দেয়ার শর্ত দেয়া হয়। কিভাবে কাদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। কার ফোনে কোন সিন্ডিকেট গুদামে ধান প্রদান করেছে। লাভের টাকা কিভাবে বন্টন করেছেন সব কিছুই ওই অডিওতে শুনা যায়। এরপর নেতা তাদের অভয় দিয়ে বলেন, আমরা মিমাংশা হয়ে গেলে এসব অভিযোগে কিছুই হবে না। সাংবাদিকদের নিউজে কি হয়। গুদামে কোন সাংবাদিককে ঢুকতে দিবে না। এমন সব কথোপকথোনও হয়েছে ওই অডিওতে।
এদিকে, স্থানীয় এক সাংবাদিক আংগারিয়া এলএসডি তে নীতিমালা বর্হিভূত ভাবে ধান সংগ্রহের বিরুদ্ধে খাদ্য মন্ত্রনালয়ের সচিব বরাবরে লিখিত আবেদন করেন। তার প্রেক্ষিতে খাদ্য সচিবের নির্দেশে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুন ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই তদন্ত কমিটিতে মাদারীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কে আহবায়ক আর ফরিদপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (কারিগরি) ও শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতি: দা:) কে সদস্য করা হয়েছে। তবে বিপত্তি বেধেছে শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতি: দা:) আব্দুর রাজ্জাক কে নিয়ে। আব্দুর রাজ্জাক শরীয়তপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবং যে সময়কার ধান ও চাল সংগ্রহ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে সে সংগ্রহের সময় ও ওই উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের দাবী স্বচ্ছ তদন্ত হলে আব্দুর রাজ্জাক কেও অপরাধীর কাঠগরায় দাড়াতে হবে। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুজনে যৌথভাবে সকল কেনাকাটা করে থাকেন। এবং দু জনের যৌথ স্বাক্ষরেই কেনাকাটা সম্পান্ন হয়। যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত তাদের একজনকে তদন্ত কমিটিতে রাখায় ”শর্শের মাঝেই ভুত” দেখছেন স্থানীয়রা। আঞ্চলিক কর্মকর্তা সুরাইয়া খাতুন দায় এড়াতে এবং অভিযুক্তদের রক্ষা করতেই এমন তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন বলে ধারনা করছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও আংগারিয়া এলএসডি’র একাধিক কর্মচারী জানায়, ২০১৭ একই গুদামে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন শাহ নেওয়াজ আলম (দিনা)। টানা দুই বছর এই গুদামে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সে সময়ে সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানের মেয়ে পরিচয়ে গুদামকে নানা অপকর্মের স্বর্গ বানিয়েছেন। সব কিছু দেখেও মুখ বুজে সহ্য করেছি। তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ইকবার হোসেন অপু কে বাবা ডাকতের দিনা। এই দুই নেতার প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছে তাই করেছেন গুদামে বসে। নিষিদ্ধ অনেক কাজ হয়েছে গুদামে দেখেও না দেখার ভ্যান করেছি। ভয়েও কেউ কিছু বলার সাহস পায়নি। ৫ আগস্টে ক্ষমতার পালাবদল হলে এবার ভোল পাল্টে বিএনপি’র প্রভাবশালী নেতাদের সেল্টার নেন শাহ নেওয়াজ আলম দিনা। ইতোমধ্যে বিএনপির এক টপ লিডারের নাতী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। কোন কোন নেতাকে বড় ভাই বানিয়ে ফেলেছেন। স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় না আনলে গুদামের পরিবেশ ঠিক হবে না।
বিজ্ঞাপন
এসব বিষয়ে ঢাকা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুনের মুঠোফোন ও হোয়াট এ্যাপে কল ও ম্যাসেজ করেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। ২৫ মার্চ তার অফিসে গিয়েও আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রককে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে তার ব্যাক্তিগত কর্মকর্তা ফারহান কে জানানো হলেও তিনি কোন সাড়া দেননি।
শরীয়তপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হুমায়ুন কবির বলেন, শাহনেওয়াজ দীনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ পড়েছে সে বিষয় তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে কতৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন। মতিউর রহমান খানের চেক জালিয়াতির অভিযোগের আমার কোন সম্পৃক্ততা নেই। এ বিষয় আমি জড়িত নই।
বিজ্ঞাপন
শরীযতপুর সদর উপজেলা গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ আলম দিনা বলেন. এসব অভিযোগ ভীক্তিহীন। আমি কোন অপরাধে সাথে জড়িত নাই। মিল মালিক মতিউর রহমান খান আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ করেছে।








