পোল্ট্রি শিল্পের নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট, নিঃস্বের পথে খামারিরা

দেশের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি শিল্প গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। টানা লোকসান, বাজারে অঘোষিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এবং বড় করপোরেট কোম্পানির আগ্রাসনের কারণে লাখ লাখ প্রান্তিক খামারি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে মুরগির বাচ্চার দাম ১০৫ টাকা স্থির রাখার কারণে খামারিরা হালিপ্রতি প্রতি ডিমে ১২ টাকার লোকসান করছেন। এই পরিস্থিতিতে অনেক খামারি তাদের খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
খাত সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ছোট ও মাঝারি খামারগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এতে দেশের পোল্ট্রি শিল্প গুটিকয়েক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মাঠ পর্যায়ের খামারিরা জানাচ্ছেন, গত চার মাস ধরে তারা ডিম বিক্রি করে উৎপাদন খরচও পূরণ করতে পারছেন না। বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হচ্ছে গড়ে সাড়ে ৯ টাকা, অথচ বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি ডিমে প্রায় ৩ টাকার লোকসান হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট খামারিদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং ঋণের বোঝায় অনেকেই এলাকায় ছুটে চলেছেন।
বিজ্ঞাপন
টাঙ্গাইল জেলা দেশের ডিম উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র। ভূঞাপুর, ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ১১ লাখ ডিম ঢাকার বাজারে যায়। কিন্তু সম্প্রতি এই এলাকায় খামারগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে এক সময়ের প্রাণবন্ত পরিবেশ এখন নীরব।
গোবিন্দাসী ইউনিয়নের খামারি রবিউল ইসলাম চকদার জানান, তিনি এক সময় স্বচ্ছল জীবন কাটাতেন, এখন অন্যের বাড়িতে দারোয়ানের চাকরি করে দিন কাটাচ্ছেন।
খামারিদের অভিযোগ, বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো মুরগির খাদ্য, ওষুধ ও বাচ্চার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’-এর মাধ্যমে খামারিদের স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
একজন খামারি জানান, কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে আমাদের এমনভাবে বেঁধে ফেলা হয় যে আমরা স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারি না। খাদ্য ও ওষুধ তাদের কাছ থেকেই কিনতে হয়, আবার ডিমও তাদের নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হয়।
চলতি মাসে খন্দকার জাহাঙ্গীর আলমের খামারে ডিম উৎপাদনের খরচ প্রতি পিস সাড়ে ৯ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ টাকায়। খামারি অভিযোগ করেছেন, বাজারে ২৪-২৬ টাকায় বিক্রি হওয়া ডিম খুচরা পর্যায়ে ৩৫-৪০ টাকায় পৌঁছে যায়, যার মধ্যবর্তী মুনাফা লুটছে সিন্ডিকেট।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআই) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রান্তিক খামারিরা যদি টিকে না থাকে, তবে দেশের পোল্ট্রি খাত গুটিকয়েক করপোরেট কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এতে ভোক্তা চরম বিপাকে পড়বেন। তিনি সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ উদ্যোগের আওতায় খামারিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা, সহজ ঋণ সুবিধা ও ভর্তুকি প্রদানের পাশাপাশি বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে খরচ কমায়, কিন্তু ছোট খামারিরা বেশি খরচের কারণে সহজেই লোকসানে পড়ে। একবার খামার বন্ধ হলে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারছে না। তাই প্রান্তিক খামারিরাও সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার আওতায় আনা প্রয়োজন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. এ বি এম খালেদুজ্জামান স্বীকার করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা কমেছে। তবে খাতের সুরক্ষায় নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
পোল্ট্রি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও ভোক্তার বাজারে মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।








