Logo

বিএলআরআইয়ে পোল্ট্রি প্রকপ্লে সাজেদুল করিম আতঙ্ক

profile picture
মো. রুবেল হোসেন
১১ মার্চ, ২০২৬, ১৩:০৭
বিএলআরআইয়ে পোল্ট্রি প্রকপ্লে সাজেদুল করিম আতঙ্ক
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)-এর এক কর্মকর্তা ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারকে ঘিরে সম্প্রতি নানা বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছে। তিনি বিএলআরআই-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতেন এবং সেই সমর্থনের মাধ্যমে প্রশাসনিকভাবে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।

বিজ্ঞাপন

২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৭ বছর মেয়াদি প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তিনি নিয়োগ পান। সমালোচকদের দাবি, তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং প্রকাশ্য সমর্থনের কারণেই তিনি এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

ড. সাজেদুল করিম সরকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিয়মিতভাবে সরকারি নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, সংবাদ ও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ প্রচার করতেন। বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও কর্মশালায় নিজের প্রকল্পের অগ্রগতি উপস্থাপনের সময়ও তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রশংসাসূচক শব্দে উল্লেখ করতেন। একাধিক ক্ষেত্রে তাকে “এশিয়ার আয়রন লেডি” বলে উল্লেখ করতে দেখা গেছে, যা সমালোচকদের মতে সরকারের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। এদিকে গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন আসার পর ড. সাজেদুল করিমের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার ভূমিকা, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তার অবস্থান এবং বর্তমান সরকারের প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান-এসব বিষয় নিয়ে তার সহকর্মী ও সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে।

বিজ্ঞাপন

পর্যবেক্ষকদের মতে, একজন সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তাই ড. সাজেদুল করিমের অতীত কার্যক্রম ও বর্তমান অবস্থান নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, তা এখন সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ১৩৪ কোটি টাকার পোল্ট্রি গবেষণা প্রকল্পে গবেষণার অগ্রগতি নেই, হয়েছে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে বাস্তবায়িত পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের পোল্ট্রি খাতকে শক্তিশালী করা।

প্রকল্পটির আওতায় দেশীয় পোল্ট্রি প্রজাতির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন, পোল্ট্রি খাদ্যের পুষ্টিমান নির্ধারণ, নিরাপদ মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খামারিদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করার কথা ছিল। একই সঙ্গে গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক গবেষণাগার সরঞ্জাম ক্রয়, পোল্ট্রি শেড নির্মাণ ও মেরামত এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে পোল্ট্রি শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারি অর্থায়নে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পটি ২০১৯ জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৭ বছর মেয়াদে পরিচালিত হচ্ছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও এর মূল লক্ষ্য-গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন-বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় প্রধানত সৈয়দপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী পোল্ট্রি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন কিংবা খামারিদের জন্য কার্যকর প্রযুক্তি হস্তান্তরের উল্লেখযোগ্য কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো পাওয়া যায়নি। প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার এই বৃহৎ গবেষণা প্রকল্পের বাস্তবিক গবেষণা ফলাফল কোথায় এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সৈয়দপুর আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন নির্মাণের লক্ষ্যে কৃষকদের নিকট থেকে ক্রয়কৃত জমির মূল্যের চেয়ে সরকারি হিসেবে অধিক দামে দেখানো হয়েছে। একই সাথে সৈয়দপুর আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রে প্রথমবার মাটি ভরাট করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং একই স্থানে আবার ২য় বার মাটি খনন করে পুকুর তৈরির জন্য অর্থ উত্তোলন করেছেন মর্মে অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পোল্ট্রি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। অথচ এত বড় অর্থায়নের একটি প্রকল্প যদি কাঙ্ক্ষিত গবেষণা ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। প্রকল্পের ব্যয়, কার্যক্রম এবং বাস্তব গবেষণা ফলাফল বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও মূল্যায়ন প্রয়োজন, যাতে জনগণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা যায়। পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের গবেষণার ফল কোথায়?

বিজ্ঞাপন

তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ বছরে সরাসরি গবেষণা কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা। এছাড়া গবেষণার সহায়ক উপকরণ যেমন রাসায়নিক দ্রব্য, গ্লাসওয়ার, বিভিন্ন ধরনের স্পেয়ার পার্টস, পোল্ট্রি ফিড, ভ্যাকসিন ও ঔষধ বাবদ বরাদ্দ ছিল আনুমানিক ১৫ কোটি টাকা। একই সঙ্গে ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের প্রধান গবেষকগণ প্রকল্পের গবেষণার জন্য নির্ধারিত মোট বরাদ্দের ২৫ শতাংশ অর্থও বাস্তবে হাতে পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। এত বিপুল অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অনুযায়ী দৃশ্যমান গবেষণা ফলাফল বা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের অগ্রগতি না থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ শীর্ষক প্রকল্পে নানা ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, প্রকল্পটির আওতায় স্থানীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য প্রায় ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ প্রশিক্ষণ সীমিত পরিসরে সম্পন্ন হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই তা আয়োজন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রকল্প পরিচালকের স্ত্রী মোছা. ফারহানা শারমিনকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হতো এবং প্রতিটি প্রশিক্ষণে তাকে একাধিক সেশন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও এই প্রকল্পের সাথে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের কোন সম্পৃক্ততা না থাকলেও গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রাকৃতিক ফিড এডিটিভস্ প্রয়োগের মাধ্যামে পোল্ট্রির মাংস ও ডিমের গুনগত মান উন্নয়ন ভ্যালু এডিশনে লেকচার দেন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফারহানা শারমিন।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, মোছা. ফারহানা শারমিন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পূর্বে প্রকল্পের বিভিন্ন দরপত্র ও কোটেশন কার্যক্রমের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ক্রয় ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কার্যক্রমেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এছাড়াও প্রকল্পের আওতায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিভিন্ন অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হলেও সেগুলোর অনেকগুলো এখনও পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীদের মতে, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে এসব যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।

প্রকল্পে পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের জন্য প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেই অর্থের একটি বড় অংশ অনিয়মের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালকের স্ত্রী মোছাঃ ফারহানা শারমিনকে প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্প পরিচালকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিয়মিতভাবে মাস্টার রোলের আওতায় বেতন গ্রহণ করছেন। উদাহরণ হিসেবে তার শ্যালকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও মাস্টার রোলের মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিপুল অর্থ ব্যয়ের এই প্রকল্পের কার্যক্রম, অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। এতে প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না এবং ঘোষিত গবেষণা লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে তা স্পষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট আওতাধীন

পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. সাজেদুল করিম মুঠোফোনে জনবাণীকে বলেন, আমার স্ত্রী ফারহানা শারমিন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই প্রকল্পে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছে। আপনি অফিসে আসেন সরাসরি বসে আলোচনা করবো। আর সঠিক তথ্য না জেনে নিউজ করলে সমস্যায় পড়বেন।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD