Logo

খালেদা জিয়ার বাড়ি ভাঙ্গার ঠিকাদার পেলেন বাফার গুদাম নির্মাণ কাজ

profile picture
মো. রুবেল হোসেন
২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৪:১৮
খালেদা জিয়ার বাড়ি ভাঙ্গার ঠিকাদার পেলেন বাফার গুদাম নির্মাণ কাজ
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

২০১০ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের ময়নুল রোডের বাড়ি রাতারাতি ভাঙ্গার জন্য ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা নিজে প্রায় একডজন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ডেকেছিলেন। তন্মধ্যে অন্যরা আপত্তি জানালেও 'মজিদ সন্স কন্সট্রাকশন' (এমএসসিএল) নিজের আগ্রহে স্ব-উদ্যোগে বাড়িটি ভেঙ্গে মাত্র ১০ মাসের মধ্যে নতুন স্থাপনা তৈরীর কন্ট্রাক্ট সাইন করোছলেন।

বিজ্ঞাপন

সেই ফ্যাসিবাদের দোসর মজিদ সন্স কন্সট্রাকশনকে বর্তমানে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব মো: ফজলুর রহমান এবং ৩৪ সার গুদাম নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো: মঞ্জুরুল হক বাফার গোডাউন নির্মাণ প্রকল্পের বিভিন্ন লটের ৫ জেলায় ৫টি সার গুদাম নির্মাণের ঠিকাদারী কাজ দিয়েছেন।

জেলাগুলো হলো- লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও কাজেরও সেটেলমেন্ট করে নোটিশ অব এ্যাওয়ার্ড (নোয়া) দিয়েছেন। প্রতিটি গুদাম নির্মাণ বরাদ্দ ৬০ কোটি টাকার কিছু কমবেশি। তাহলে হিসাব করলে দাঁড়ায় ৩০০ কোটি টাকার মত। বিশেষ চুক্তিতে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে রেটকোট ফাঁস করেছেন পিডি মো: মঞ্জুরুল হক।

বিজ্ঞাপন

এই মঞ্জুরুল হকের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ২০২৫ সালে একাধিক জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হলে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব অপূর্ব কুমার মন্ডল। তিনি জানান, প্রায় ৩/৪ মাস আগেই তদন্ত রিপোর্ট সচিবের দপ্তরে জমা দিয়েছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বা প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়নি।

২০২৫ সালে একটি অভিযোগের সুত্র ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয় একটি তদন্ত ও অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে দুদক। দুদক থেকে ৩ সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়। যে টিমের প্রধান ছিলেন উপ-পরিচালক মো: আজিজুল হক। সদস্য ছিলেন সহকারী পরিচালক মো: নাছরুল্লাহ ও উপসহকারী পরিচালক মো: হাবিবুর রহমান।

দুদকের উপ-পরিচালক মো: আজিজুল হক ৪ দফা ডকুমেন্ট বা দলিলপত্র চেয়ে বিসিআইসির চেয়ারম্যানকে পত্র দিয়ে ছিলেন। কিন্তু সেটিও বিশেষ তদবীরে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিসিআইসি চেয়ারম্যান ও প্রকল্প পরিচালক সেটেলমেন্টের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের দোসর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স কন্সট্রাকশনকে একাধিক লটে ৮টি সার গুদাম নির্মাণের যে কার্যাদেশ দিয়েছেন তার নেপথ্যে রয়েছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন। এই মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের বালিশকান্ডে বেশ আলোচিত ছিলো। মাজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ওয়েবসাইটের সূত্রে জানা যায়, তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট সিটি কর্পোরেশনে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের নির্মাণ কাজ করেছে। তখন এই প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন একটি ভবনের একাংশ ভেঙে পড়ে।

এই মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন রাজশাহীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম রুয়েটের যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগের ১০ তলা ভবন নির্মাণ কাজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ তলা সাইন্স বিল্ডিং ও ১০তলা বিশিষ্ট শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান হল নির্মাণ কাজ। এসব কাজ অতি নিন্মমানের হওয়ায় তার একটি ভেংগে পড়েছিল। এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের বালিশকান্ডে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়ে দুদক একাধিক মামলা দায়ের করে। এক মামলায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ হোসেনকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে আটক থাকার পর হাইকোটের একটি বেঞ্চ থেকে জামিন পান।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু দুদক জামিনের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপীল করে। হাই কোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দুদকের আবেদনের শুনানি হয় গত ২৯ অক্টোবর। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ তার জামিনের আদেশ স্থগিত করে আদেশ দেন। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।

এর আগে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি ভবনে অস্বাভাবিক মূল্যে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয় সংক্রান্ত দুর্নীতির এক মামলায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ হোসেনকে জামিন দেন হাইকোর্ট। গত ২১ অক্টোবর বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে আসিফের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী ফিদা এম কামাল। অন্যদিকে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক।

বিজ্ঞাপন

২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি ভবনে অস্বাভাবিক মূল্যে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। পাবনায় দায়ের হওয়া এসব মামলায় কারাগারে পাঠানো হয় আসিফ হোসেনকে। তার বিরুদ্ধে দু’টি মামলায় ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪২ হাজার ও ৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনা বালিশকান্ড নামে পরিচিতি পেয়েছে।

সব থেকে মজার বিষয় হলো ৩৪ সার গুদাম নির্মাণ প্রকল্পের দুর্নীতির বিষয় নিয়ে ২০২৫ সালে একাধিক জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হলে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব অপূর্ব কুমার মন্ডলকে করা হয় তদন্ত কমিটির প্রধান। তিনি তদন্ত করতে গিয়ে প্রকল্পের “মাখন” খাওয়ার লোভে নিজেই দরপত্র মূল্যায়ণ কমিটিতে ঢুকে পড়েন। যা একটি নজিরবিহিন ঘটনা।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ইজিপি শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই যদি দরপত্র মূল্যায়ণ কমিটির সদস্য বনে যান তাহলে সেই তদন্তের আর কোন অর্থ থাকে না। ওটা শ্রেফ লোক দেখানো তদন্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এটা একটা ব্যাড প্রাকটিস। এজন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা “তিরস্কার” শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। একই সাথে ওই তদন্ত কমিটির রিপোর্টও অগ্রহনযোগ্য।

বিজ্ঞাপন

এ সংক্রান্ত বিষয়ে ৩৪ বাফার গুদাম নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পরিচালক মো: মঞ্জুরুল হক বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন (এমএসসিএলকে) কাজ দেওয়া হয়েছে। এখানে নিয়মের কোন বত্যয় ঘটেনি। তার বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত রিপোর্ট আমার পক্ষে হয়েছে তাই মন্ত্রণালয় কোন ব্যবস্থা নেয়নি। অপরদিকে দুদকের তদন্তের ব্যপারে তিনি আরও বলেন, তারা (দুদক) যে সব দলিলপত্র, নথি ও তথ্য চেয়েছিল সেগুলো দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, মজিদ সন্স কন্সট্রাকশন দেশের একটি কুখ্যাত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ হোসেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার একান্ত অনুগত লোক। তার বিরুদ্ধে দুদকে ও আদালতে দুর্নীতির মামলা চলমান রয়েছে। সর্বোপরি এই প্রতিষ্ঠান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ি ভাঙ্গার মত অমানবিক কাজটি হাসিমুখে করেছেন।

এমন একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বাফার ৮টি গুদাম নির্মাণের কাজ দিয়ে বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো: ফজলুর রহমান ও প্রকল্প পরিচালক মো: মঞ্জুরুল হক প্রমাণ করেছেন যে, তারা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার একান্ত লোক। বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো: ফজলুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি এ প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য না করে প্রকল্প পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করার কথা বলে মুঠোফোন কেটে দেন।

জেবি/এসডি
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD