সত্তর দশকের সেই ভয়াবহ জ্বালানি তেল সংকটের সময় কী হয়েছিল?

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এটি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়েও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। তবে একইসঙ্গে অনেকে মনে করছেন, বর্তমান বিশ্ব আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত ও সহনশীল।
বিজ্ঞাপন
নৌপরিবহন খাতের বিশ্লেষক এবং শিপিং কোম্পানি মায়ের্সকের সাবেক পরিচালক লার্স জেনসেনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ-এর সতর্কবার্তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে বিশ্ব বর্তমানে জ্বালানি নিরাপত্তার এক বড় সংকটের মুখে।
১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট: কী ঘটেছিল?
১৯৭৩ সালে ইয়োম কিপুর যুদ্ধ চলাকালে আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি দেশের ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পাশাপাশি ইচ্ছাকৃতভাবে তেল উৎপাদনও কমিয়ে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
এর ফলাফল ছিল তাৎক্ষণিক ও গভীর—মাত্র কয়েক মাসে তেলের দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অনেক দেশে রেশনিং চালু হয়, যা দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধু জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর প্রভাব পড়ে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও শিল্প উৎপাদনে। অনেক দেশে সামাজিক অস্থিরতা, ধর্মঘট ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও কয়েক বছরব্যাপী মন্দা দেখা দেয় এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন পর্যন্ত ঘটে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমান পরিস্থিতি: কী ঘটছে এখন?
সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, ফলে এর প্রভাব দ্রুত বৈশ্বিক বাজারে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে কিছু সময়ের জন্য সরবরাহ সচল থাকলেও শিগগিরই ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে। এমনকি প্রণালি দ্রুত খুলে গেলেও এর প্রভাব কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, যার ফলে জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
১৯৭০-এর তুলনায় বর্তমান সংকট কতটা ভিন্ন?
বিশ্লেষকদের মতে, দুই সময়ের সংকটের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের সংকট ছিল পরিকল্পিত নীতিগত পদক্ষেপের ফল, যেখানে তেল উৎপাদন ও সরবরাহ ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে বর্তমান সংকট মূলত ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও সরবরাহ চেইনের বিঘ্নের কারণে তৈরি হয়েছে। এছাড়া এখনকার বিশ্বে জ্বালানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময়, অনেক দেশ বিকল্প জ্বালানি ও কৌশলগত মজুত গড়ে তুলেছে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭০-এর দশকে সংকটটি প্রধানত উন্নত দেশগুলোকে প্রভাবিত করেছিল, যারা অর্থনৈতিকভাবে তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো, যাদের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম।
বিজ্ঞাপন
ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি তাদের অর্থনীতিতে দ্রুত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
সামনে কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে চলমান সংঘাতের ওপর। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: ৯ বছর আগে নথি চুরি খোঁজ নেয়নি রাজউক
তবে ইতিবাচক দিক হলো—বর্তমানে অনেক দেশের কাছে কৌশলগত তেলের মজুত রয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে বোঝাপড়া আগের তুলনায় অনেক উন্নত। তবুও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সংঘাত নিরসন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করাই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: বিবিসি বাংলা








