নির্দলীয় নির্বাচন বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষ করবে ভোটের মাঠ?

স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বাতিল করে বড় ধরনের আইনি পরিবর্তন এনেছে সরকার। জাতীয় সংসদে একযোগে পাঁচটি সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশন পর্যন্ত সব স্তরের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের আনুষ্ঠানিক পথ বন্ধ করা হয়েছে। তবে আইন পরিবর্তনের পরও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে বিশ্লেষক মহলে।
বিজ্ঞাপন
গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর সংশ্লিষ্ট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন সংক্রান্ত আইন। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর এসব আইন কার্যকর হবে।
নতুন আইনের অধীনে কোনো রাজনৈতিক দল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরাসরি প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে না। ফলে সব প্রার্থীই ‘স্বতন্ত্র’ বা নির্দলীয় পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন। এই পরিবর্তন দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার পাঁচটি স্তরেই প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে জেলা পরিষদ ছাড়া বাকি চার স্তরে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকেন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে একসময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন পুরোপুরি নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতো। তবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালু করা হয়। তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল—এতে জবাবদিহিতা বাড়বে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয় সহজ হবে।
কিন্তু বাস্তবে এই পদ্ধতির কারণে নানা নেতিবাচক দিক সামনে আসে। মনোনয়ন বাণিজ্য, সহিংসতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ার অভিযোগ ওঠে। ফলে অনেক যোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে শুরু করেন।
দলীয় প্রতীক বাতিলের দাবি বহুদিন ধরেই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে উঠে আসছিল। তাদের মতে, নির্দলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং যোগ্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।
বিজ্ঞাপন
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকার সংস্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রথমে অধ্যাদেশ জারি করে দলীয় প্রতীক বাতিল করা হয়। পরে সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সেটিকে স্থায়ী আইনি কাঠামো দেওয়া হলো।
তবে কেবল আইনের পরিবর্তনই কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, দীর্ঘদিনের দলীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না।
তার মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারে। এতে প্রকৃত নির্দলীয় ও যোগ্য প্রার্থীরা আগ্রহ হারাতে পারেন, যা অতীতের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, দলীয় মনোনয়নের কারণে অতীতে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে, ফলে প্রতিযোগিতা কমে গেছে। অথচ বেশি প্রার্থী থাকলে যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিভক্তি সমাজের গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্দলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সরকারকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতি দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, আইনি কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবে সেটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং ভোটের মাঠে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর।








