‘শূন্য রিটার্ন’ দিয়ে ভ্যাট ফাঁকি, গোয়েন্দা নজরে ৯৫৩ প্রতিষ্ঠান

কর অব্যাহতির সুবিধা নিয়েও বছরের পর বছর ভ্যাট পরিশোধ না করার একটি নতুন কৌশল উন্মোচন করেছে ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভ্যাটযোগ্য পণ্য বাজারে বিক্রি করা সত্ত্বেও তা গোপন রেখে ‘শূন্য ভ্যাট রিটার্ন’ জমা দিয়ে শত শত প্রতিষ্ঠান রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে এ ধরনের অনিয়মে জড়িত ৯৫৩টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
বিজ্ঞাপন
গোয়েন্দা অনুসন্ধানে জানা গেছে, হুইলচেয়ার, কমোড চেয়ার এবং বিভিন্ন ধরনের পোর্টেবল চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা শুল্ক ও কর থেকে ছাড় পেয়ে থাকেন। তবে এসব পণ্য দেশে বিক্রি করার সময় আইন অনুযায়ী মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করে নিয়মিত ‘নিল’ বা শূন্য রিটার্ন দাখিল করছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের আমদানি ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই অনিয়ম ধরা পড়েছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে ৯৫৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২১টির বিরুদ্ধে প্রায় ৫৫ কোটি ১৭ লাখ টাকার বেশি ভ্যাট ফাঁকির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, সুদ ও জরিমানা যুক্ত হলে এই অঙ্ক শত কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
জনবল ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাকি ৯৩২টি প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তদন্ত ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেশের ১২টি ভ্যাট কমিশনারেটকে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র পর্যালোচনা করে ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট নির্ধারণ এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাজ শুরু করবে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞাপন
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ব্যবহৃত হুইলচেয়ার, হাঁটার লাঠি, ছড়ি ও পোর্টেবল কমোড চেয়ারের মতো বেশিরভাগ চিকিৎসা সহায়ক পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এসব পণ্য সাধারণত আমদানিকারকদের মাধ্যমে দেশে আসে এবং পরে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই খাতে মোট ৯৫৩টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই নিয়মিত ‘শূন্য ভ্যাট রিটার্ন’ জমা দিয়েছে, যদিও বাস্তবে তারা পণ্য বিক্রি করেছে।
ভ্যাট গোয়েন্দাদের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নামমাত্র ভ্যাট পরিশোধ করলেও অধিকাংশই স্থানীয় পর্যায়ে প্রযোজ্য ভ্যাট প্রদান করেনি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে সরকার।
বিজ্ঞাপন
গোয়েন্দা তদন্তে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ট্রেড ভিশন লিমিটেড : প্রায় ১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা, ইউনিমিড লিমিটেড : প্রায় ১৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, তাজ ট্রেডার্স প্রাইভেট লিমিটেড : প্রায় ৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা, এসএস এন্টারপ্রাইজ : প্রায় ৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, মেডিকিট ইন্টারন্যাশনাল : প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ টাকা, রুশদা এন্টারপ্রাইজ : প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং ইউনাইটেড সার্জিক্যাল লিমিটেড : প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরো তালিকার সব প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই শেষ হলে মোট ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
বিজ্ঞাপন
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অবশিষ্ট ৯৩২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ভ্যাট কমিশনারেটকে। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন কমিশনারেটেই সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম, যশোর, রাজশাহী, খুলনা, কুমিল্লা, রংপুর ও সিলেট কমিশনারেটেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তদন্তের আওতায় এসেছে।
‘শূন্য ভ্যাট রিটার্ন’ বা নিল রিটার্ন বলতে এমন একটি বিবরণীকে বোঝায়, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের পরিশোধযোগ্য ভ্যাটের পরিমাণ শূন্য দেখায়। সাধারণত ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকলে বা ভ্যাট অব্যাহতি পাওয়া পণ্য নিয়ে কাজ করলে এমন রিটার্ন জমা দেওয়া যায়।
তবে বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পণ্য বিক্রি করা সত্ত্বেও তা গোপন রেখে এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
ভ্যাট ফাঁকির ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে বকেয়া কর আদায়ের পাশাপাশি জরিমানা ও সুদ আরোপ করতে পারে। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের মূসক নিবন্ধন (বিআইএন) স্থগিত বা বাতিল করা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা কিংবা প্রয়োজনীয় নথিপত্র জব্দ করার ক্ষমতাও রয়েছে সংস্থাটির।
এছাড়া গুরুতর ভ্যাট ফাঁকির ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করা যেতে পারে। আদালতে দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড— উভয় ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।








