বছরের পর বছর ফাইলবন্দি কারাবন্দিদের অ্যাম্বুলেন্স

দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অথচ বন্দিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনিক জটিলতায় ঝুলে আছে। ফলে জরুরি চিকিৎসা পরিবহনের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
বিভিন্ন সময়ের একাধিক ঘটনার মধ্য দিয়ে এই সমস্যার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে গাজীপুরের তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দি মোছা. কছিরন মারা যান। গত বছরের এপ্রিলে ভোলা জেলা কারাগারের বন্দি শফিউল আলম শফিও হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন। একই বছরের অক্টোবরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় ছইবুর রহমান নামে আরেক বন্দির মৃত্যু হয়।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে ৪৯১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এ অবস্থায় বন্দিদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি কারা প্রশাসনও সমালোচনার মুখে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
কারা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক সময় অসুস্থ বন্দিদের রিকশা, ভ্যান বা অন্য সাধারণ পরিবহনে করে হাসপাতালে নিতে হয়। এতে পথিমধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। বিষয়টি প্রশাসনের জন্যও বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে দেশের ৭৪টি কারাগারের মধ্যে মাত্র ২০টিতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। টিওএন্ডইভুক্ত ১৫টি এবং প্রকল্পের আওতায় ক্রয় করা ৮টিসহ মোট অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা মাত্র ২৩টি। অথচ এসব কারাগারের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ১৫৭ জন হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ৭৮ হাজার বন্দি রয়েছে, যা কখনো কখনো ৯০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
কারা অধিদপ্তর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমে ১০৭টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পরে বাজেট সংকোচনের নির্দেশনা অনুযায়ী সেই সংখ্যা কমিয়ে ৪৬টি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে প্রায় সাড়ে তিন বছর পার হলেও এখনো কোনো অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক উদ্যোগ হিসেবে কারা অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে পর্যায়ক্রমে এসব অ্যাম্বুলেন্স ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়ে পত্র পাঠিয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অ্যাম্বুলেন্স সংকট তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কারণ। বিষয়টি সমাধানে বারবার চেষ্টা করা হলেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে সিদ্ধান্ত এগোচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১১২ জন বন্দি হাসপাতালে বা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছেন। অন্যদিকে কারা অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ হাজার ৫৭৭ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছেন ৪৯১ জন।
কারা সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২২ সালে কারা হেফাজতে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয় এবং চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ হাজারের বেশি বন্দি। ২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৫৫ জনের এবং চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ১৩ হাজার ৮০০ বন্দি। ২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ১২০ জনের। ২০২৫ সালে কারাগারে ১৭২ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ছয়জন আত্মহত্যা করেছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রতিটি কারাগারের জন্য অন্তত একটি করে অ্যাম্বুলেন্স থাকা জরুরি। কিন্তু বর্তমানে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রাজস্ব বাজেট থেকে একসঙ্গে অনেক অ্যাম্বুলেন্স কেনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। তাই একটি প্রকল্পের মাধ্যমে অন্তত ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত কেনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কারা অধিদপ্তরের অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব একাধিকবার ফেরত পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি আবারও প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠানো হলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি এখনও সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব নতুন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রস্তাবটি ফেরত দেওয়া হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, ২০২২ সাল থেকে বিষয়টি নিয়ে চেষ্টা চলছে এবং কয়েক দফা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি। অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
তার ভাষ্য, অনেক সময় অভিযোগ ওঠে বন্দিরা চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন। কিন্তু দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না থাকলে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
মানবাধিকার ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকলে তা মানবাধিকার প্রশ্নেরও জন্ম দেয়।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগারে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় বন্দিদের মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ। অসুস্থ বন্দিকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব হলে তা প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি আইনি জটিলতারও কারণ হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কারাগার শুধু বন্দিশালা নয়; এটি একটি উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন প্রশাসনিক কাঠামো। সেখানে বন্দিদের চিকিৎসা পরিবহন ব্যবস্থাও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ হওয়া জরুরি।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মু. জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি সামনে এলে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে।








