ভাইরালের নেশায় মহাসড়কে ‘ডেথ ট্র্যাক’, বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা এখন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে দেশের মহাসড়কগুলোতে। রিলস, ফেসবুক ভিডিও কিংবা টিকটকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট করতে গিয়ে একদল কিশোর ও তরুণ সরাসরি মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার মতোই, ‘চাঁদনী পরিবহন’-এর একটি বাসের বিপজ্জনক চালনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিজ্ঞাপন
ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কে অন্যান্য যানবাহন উপেক্ষা করে হঠাৎই অস্বাভাবিকভাবে ‘বাউলি’ (ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক) নেয় বাসটি। একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডিভাইডারে আঘাত করে। অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ালেও ঘটনাটি আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। বগুড়ার শেরপুর এলাকার নাবিল হোটেল সংলগ্ন মহাসড়কে ঘটে এই ঘটনা, যা ক্যামেরাবন্দি করেন রাস্তার পাশে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন ‘ভিডিও শিকারি’।
তবে এই দৃশ্যের পেছনের বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভাইরাল কনটেন্ট তৈরির উদ্দেশ্যে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। ‘বাস লাভার’ পরিচয়ে পরিচিত কিছু তরুণ চালকদের উসকানি দিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক বাঁক নেওয়া বা প্রতিযোগিতামূলকভাবে অন্য বাসকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করছে।
বিজ্ঞাপন
একটি অভ্যন্তরীণ ভিডিওতে দেখা যায়, বাসের চালকের পাশেই ইঞ্জিন কাভারের ওপর বসে কয়েকজন কিশোর মোবাইল ক্যামেরা হাতে এসব বিপজ্জনক মুহূর্ত ধারণ করছে। তাদের আচরণে কোনো ভয় বা সতর্কতার চিহ্ন নেই; বরং দ্রুত ভাইরাল হওয়ার অদ্ভুত উন্মাদনা স্পষ্ট।
তথ্য বলছে, মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভিডিওগ্রাহক এবং বাসের ভেতরের সদস্যদের মধ্যে পূর্বপরিকল্পিত যোগাযোগ থাকে। নির্দিষ্ট পয়েন্টে ক্যামেরা নিয়ে অবস্থান নেওয়া হয়, যাতে বাসের বেপরোয়া গতির দৃশ্য নিখুঁতভাবে ধারণ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে পুরো বাস ভাড়া করে এই কার্যক্রম চালানো হয়, যেখানে যাত্রীরা সবাই ওই গ্রুপের সদস্য।

এই তথাকথিত ‘বাস লাভার’ গোষ্ঠীগুলো সামাজিক মাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে রেস বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেখানে উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করে চালকদের আক্রমণাত্মক ড্রাইভিংয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়। এমনকি গভীর রাতে হেডলাইট বন্ধ করে গাড়ি চালানোর মতো আত্মঘাতী কাজও ‘বীরত্ব’ হিসেবে প্রচার পাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ঘটনায় জড়িত এক তরুণ দাবি করেন, চালক নিজ ইচ্ছায় বাস চালিয়েছেন এবং সেখানে কোনো সাধারণ যাত্রী ছিল না। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, প্রায় সব বড় পরিবহনের চালকরাই এখন এই প্রবণতার প্রভাবে কখনও কখনও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন, বিশেষ করে যখন তারা রাস্তার পাশে ক্যামেরা হাতে তরুণদের দেখতে পান।
এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাসের রেসিং করতে গিয়ে ট্রাক দুর্ঘটনার ঘটনা সামনে আসে। সেই সময় ভিডিওতে দেখা যায়, দুর্ঘটনার পর আহতদের সাহায্য না করে ভিডিও ধারণেই ব্যস্ত ছিল সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার ইতোমধ্যে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দুর্ঘটনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯.৫ শতাংশ বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৩৮ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩১ হাজারের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। অন্যদিকে সরকারি হিসেবে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার মৃত্যু এবং ১০ হাজারের বেশি আহতের তথ্য পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব দুর্ঘটনার বড় একটি অংশের সঙ্গে বেপরোয়া বাসচালনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, যা এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতায় আরও বাড়ছে।

দুর্ঘটনা ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়কে কার্যকর নজরদারির অভাবেই এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, গণপরিবহনকে ‘রেসিং কার’ হিসেবে ব্যবহার বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সার্বক্ষণিক সিসিটিভি মনিটরিং জরুরি।
বিজ্ঞাপন
হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ এই প্রবণতাকে ‘ভয়ংকর নেশা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সাময়িক বিনোদনের জন্য এমন কর্মকাণ্ড যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তিনি জানান, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কেউ এমন ঝুঁকিপূর্ণ কার্যকলাপ দেখলে দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রতিযোগিতা যখন জীবনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত ঝুঁকি নয়—সমগ্র সড়ক ব্যবস্থার জন্যই হুমকি হয়ে ওঠে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’ ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।








