কৃষি খাতকে উন্নত করতেই খাল খননের কর্মসূচি

কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আজ সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
প্রথম ধাপে সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়ের অধীন চারটি সংস্থা মোট ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খননের কাজ হাতে নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে চলমান প্রকল্পগুলোর আওতায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পাশাপাশি বৃহৎ পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নতুন প্রকল্প প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সোমবার (১৬ মার্চ) সকালে দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া খাল খননের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সময়ে দেশের ৫৪টি জেলায় একযোগে খাল খনন কার্যক্রম শুরু হবে। বিভিন্ন জেলায় সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা।
বিজ্ঞাপন
এর আগে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ সালে খাল খনন কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও উল্লেখ করা হয়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ নতুনভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিলুপ্তপ্রায় ৫২০টি নদী, অসংখ্য খাল এবং তাদের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা এবং সেচব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। এরপর থেকেই খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে ৯ মার্চ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে চারটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, মার্চ থেকে জুনের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৩১৮ কিলোমিটার, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ৪৫৮ কিলোমিটার, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থা (বিএমডিএ) ১১ কিলোমিটার এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৪১৭ কিলোমিটার খাল খননের কাজ সম্পন্ন করবে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বছর থেকে পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যে এ চারটি সংস্থা নতুন প্রকল্প গ্রহণ করবে। কোন সংস্থা কত কিলোমিটার খাল খনন করবে, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়াও চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (মনিটরিং) মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষিজমিকে সেচ সুবিধার আওতায় আনা, পানিধারণ ক্ষমতা বাড়ানো এবং খালের উৎস থেকে নদী পর্যন্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের উন্নয়নেও এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের খননকাজ আসন্ন বর্ষার আগেই শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী দেশে মোট কতটি খাল রয়েছে এবং তাদের মোট দৈর্ঘ্য কত—তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। অনেক খাল সময়ের সঙ্গে ভরাট হয়ে গেছে। তবে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের নথিতে বিএডিসির খনন করা খালগুলোর অবস্থা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ জানান, গত ২৫ বছরে বিএডিসি মোট ১৪ হাজার ৬২০ কিলোমিটার খাল খনন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৩৭০ কিলোমিটার খাল সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভরাট হয়ে গেছে। বর্তমানে সচল রয়েছে প্রায় ৫ হাজার ২৫০ কিলোমিটার খাল।
তিনি আরও বলেন, খাল খনন কার্যক্রম টেকসই করতে হলে খালের উৎস থেকে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার খনন পরিকল্পনার মধ্যে যাতে কোনো ধরনের দ্বৈততা না থাকে, সেজন্য সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, নতুন প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) দুই মাসের মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। এরপর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের পর আগামী ডিসেম্বর থেকে নতুন প্রকল্পের আওতায় খাল খননের কাজ শুরু করা যাবে।
এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সভাপতিত্বে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে খাল খনন কর্মসূচি সমন্বয়ের দায়িত্ব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়। সভায় মন্ত্রী জানান, আগামী চার বছরের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘দেশব্যাপী নদী–নালা–খাল, জলাধার ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে খাল খননের একটি সামগ্রিক রূপরেখাও উপস্থাপন করা হয়। সেখানে জানানো হয়, চলমান প্রকল্পের আওতায় ৭ হাজার ৪০২ কিলোমিটার এবং নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ১২ হাজার ৫৯৮ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে।
বিজ্ঞাপন
এ কর্মসূচির আওতায় শুধু খননযন্ত্র বা এক্সক্যাভেটর ব্যবহার নয়, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করেও খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন, খনন করা খালের দুই পাশে ফলজ গাছ লাগাতে হবে এবং খননের সময় উত্তোলিত মাটি যেন আবার খালে পড়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
খাল খনন কর্মসূচি প্রসঙ্গে পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, খাল খনন একটি প্রযুক্তিগত বিষয় এবং এ ধরনের কাজের জন্য সুনির্দিষ্ট নকশা থাকা জরুরি। পরিকল্পনা ছাড়া শুধু খনন কার্যক্রম চালালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
তার মতে, প্রথমে পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে খাল খননের মূল উদ্দেশ্য কী। খনন নিজেই লক্ষ্য, নাকি কোনো বৃহত্তর উদ্দেশ্য অর্জনের উপায়—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। উদ্দেশ্য নির্ধারণ সঠিকভাবে করা গেলে খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম প্রকৃত অর্থেই কার্যকর হবে।








