এক বছরে ৩৪% বৃদ্ধি হয়েছে এলপিজির দাম, ৪ মাসেই বাড়তি ৬৩৪ টাকা

দেশের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম (এলপিজি) গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এলপিজির দাম প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সর্বশেষ এলপিজির দাম এক হাজার টাকার নিচে নেমেছিল। এরপর থেকে ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা এই পণ্যের দাম বর্তমানে ১২ কেজি সিলিন্ডারের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এর দাম ছিল ১ হাজার ৪৫০ টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে মূল্য বেড়েছে প্রায় ৪৯০ টাকা, যা শতাংশের হিসেবে ৩৪-এর কাছাকাছি।
চলতি বছরের শুরু থেকেই দাম বাড়ার প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। জানুয়ারিতে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৫৬ টাকায়। এরপর এপ্রিলের শুরুতে বড় ধরনের উল্লম্ফনে দাম পৌঁছে যায় ১ হাজার ৭২৮ টাকায়। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও ২০০ টাকা বাড়িয়ে বর্তমান ১ হাজার ৯৪০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ বছরের প্রথম চার মাসেই মূল্য বেড়েছে ৬৩৪ টাকা।
বিজ্ঞাপন
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ওঠানামা, জাহাজ ভাড়া ও আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন দাম নির্ধারণে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েছে বলে জানা যায়। তবে এতে ভোক্তাদের স্বার্থ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এলপিজির আমদানি নির্ভরতা এবং বেসরকারি খাতের প্রাধান্য বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক হতে দিচ্ছে না। সরকারি উদ্যোগে উৎপাদিত এলপিজির সরবরাহও সীমিত হওয়ায় পুরো বাজার কার্যত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এলপিজি অপারেটরদের সংগঠনের এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলপিজির প্রিমিয়াম সবসময় স্থির থাকে না। বর্তমানে জাহাজ পরিবহন ও বীমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সরাসরি দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দাম কমার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের বাস্তবতার পার্থক্যও স্পষ্ট। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে অনেক এলাকায় ১২ কেজি সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে, যা ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে দামের পার্থক্যও লক্ষণীয়। কিছু প্রতিষ্ঠানের সিলিন্ডার ২ হাজার টাকার আশপাশে বিক্রি হলেও কিছু ক্ষেত্রে তা ২ হাজার ২০০ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সরবরাহ সংকট এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এ বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে, জ্বালানি খাতে সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও পড়ছে জনজীবনে। পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় এলপিজির দাম বাড়া সাধারণ মানুষের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজধানীর এক বাসিন্দা জানান, পাইপলাইনের গ্যাস থাকলেও নিয়মিত সরবরাহ না পাওয়ায় এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে মাসিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
বিইআরসির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিতভাবে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে দাম সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।








