Logo

ডিপিডিসি’র প্রকৌশলী জিয়াউল স্মার্ট মিটার দুর্নীতির মাস্টার

profile picture
বশির হোসেন খান
২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ২০:৩২
ডিপিডিসি’র প্রকৌশলী জিয়াউল স্মার্ট মিটার দুর্নীতির মাস্টার
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি’র) স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রকল্প ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকল্পটির পরিচালক শেখ মো. জিয়াউল হাসান দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাতের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং সেই প্রভাবের বলয়েই গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগ পান। দুর্নীতি দায় প্রকল্প পরিচালক পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা-৪ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব হাসান সাদী স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে ওই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. জিয়াউল হাসানকে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার গ্রাহককে প্রত্যাশিত সেবা না দিয়ে ভোগান্তিতে ফেলছে। ব্যালেন্স না থাকায় মিটার বন্ধ হয়ে গেলেও তাৎক্ষণিক রিচার্জের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হয় না। গ্রাহককে অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘণ্টা। বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করছে, গ্রাহকের এই ভোগান্তির জন্য দায়ী স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতা। তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ক্রয়-বাণিজ্য, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়মের সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে গড়ে উঠেছে সন্দেহজনক সম্পদের পাহাড় যার মধ্যে রয়েছে বিলাসবহুল গাড়ি, নগরীর অভিজাত এলাকায় স্থাবর সম্পত্তি এবং অপ্রদর্শিত সম্পদের অভিযোগ।

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অনিয়ম কেবল একটি ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন, যেখানে জবাবদিহিতার ঘাটতি ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়।

এদিকে, ভোগান্তিতে পড়া গ্রাহকদের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি এখন উল্টো জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে যা বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, ডিপিডিসি কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “ডিপিডিসি’র আওতাধীন এলাকায় আট লাখ পঞ্চাশ হাজার স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন (বিশেষ সংশোধিত)” শীর্ষক প্রকল্পটি নির্ধারিত সময় ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে বর্তমান প্রকল্প পরিচালককে পরিবর্তন করে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ প্রদান করা প্রয়োজন। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাপ্তির স্বার্থে নতুন একজন দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেয়া হলো।

বিজ্ঞাপন

ডিপিডিসির প্রকৌশলীরা জানান, এই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এই মিটারের মাধ্যমে গ্রাহককে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা এবং সঠিক বিদ্যুৎ বিলের নিশ্চয়তা দেয়া। মিটারটিতে টাকা শেষ হয়ে গেলে অনলাইনে যেকোনো সময় রিচার্জ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ চালু হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। যাতে গ্রাহককে বিদ্যুৎ অফিসে ধরণা দিতে না হয়। কিন্তু তা হচ্ছে না।

জানা যায়, এই প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যেই রাজধানীর আদাবর, ধানমন্ডি, জিগাতলা, সাত মসজিদ, পরীবাগ, বনশ্রী ও ডেমরা এলাকায় প্রায় আড়াই লাখ মিটার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া শ্যামপুর ও ফতুল্লা এলাকায় মিটার স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।

প্রকল্পটির নথিপত্র বলছে, প্যাকেজ ১-এর আওতায় ২০২০ সালের ২০ জুন ১৬২.১৬ কোটি টাকার চুক্তি হয় অকুলিন টেক বিডি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্যাকেজ ২-এর আওতায় ২০২২ সালের ১৬ এপ্রিল ১২.৭২ কোটি টাকায় কাজ পায় কম্পিউটার সার্ভিসেস লিমিটেড ও ল্যান্ডিস প্লাস। জিওয়াইআর। আর প্যাকেজ ৩-এর আওতায় ওয়াশিয়ন গ্রুপ লিমিটেড জেভি গ্লোবাল মার্কেটিং সার্ভিসেস ২০২২ সালের ১৬ এপ্রিল ১২.৬২ কোটি টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, চুক্তির সময় মিটারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য থেকে বেশি ধরা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ পাইয়ে দেয়ায় মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি। মূলত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয় ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীকে তুষ্ট করতেই ডিপিডিসি’র তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান এই প্রকল্প গ্রহণের ব্যাপারে বেশ ‘তৎপর’ ছিলেন। সূত্রের দাবি, এভাবেই একটি চক্র লুটে নিয়েছে বিশাল অংকের টাকা।

এদিকে, স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার যেসব এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে, বেশির ভাগ জায়গায় এই মিটার নিয়ে গ্রাহকের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বলছেন, ব্যালেন্স না থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিটার বন্ধ হয়ে গেলে তৎক্ষণাৎ অনলাইনে রিচার্জ করলেও বিদ্যুৎ চালু হয় না। স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস অথবা অনলাইনে অভিযোগ দিলেও সমাধান মিলে আট ঘণ্টা পর। আর ডিপিডিসির প্রকৌশলীরা বলছেন, গ্রাহকের ভোগান্তির বিষয়ে ডিপিডিসির আইসিটি বিভাগকে জানানো হলেও তারা দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেয় না।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ধানমন্ডি, সাত মসজিদ, পরীবাগ, আদাবর ও বনশ্রী ডিভিশনের কয়েকজন প্রকৌশলীর সঙ্গে। তাঁরা জানান, স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার নিয়ে গ্রাহকের যে সমস্যা হচ্ছে তা ওই প্রতিষ্ঠানের দক্ষ লোকবলের সংকট ও সফটওয়ার জটিলতার কারণে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিটার স্থাপনকারী ডিভিশনগুলোতে লোক রেখেছে দু-একজন করে। তা-ও আবার তারা ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দিচ্ছে না। এতে করে গ্রাহকদের কাছে ডিপিডিসি’র ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অনেক সময়, ডিপিডিসির প্রকৌশলীরা গ্রাহকদের তোপের মুখে পড়ছেন।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনশ্রী ডিভিশনের এক প্রকৌশলী বলেন, আমার এখানে স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারের গ্রাহক রয়েছেন ৪৮ হাজারের বেশি। এগুলো দেখভালের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লোক রেখেছে মাত্র দুজন। প্রতিদিন গ্রাহকের অজস্র অভিযোগ আসে, দ্রুত তা সমাধান করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। আদাবর ডিভিশনের এক প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চলতি মাসের প্রথম দিকে এই ডিভিশনে স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারের সফটওয়ার জটিলতায় একদিনে আট ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎহীন ছিলেন আটশতাধিক গ্রাহক। একই ঘটনা ঘুরেফিরে ঘটছে অন্য ডিভিশনগুলোতেও।

সূত্রের দাবি, স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার কেন গ্রাহককে প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না, তা নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। প্রকল্পের ধীরগতি নিয়েও কথা উঠেছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে ‘সন্তুষ্ট’ নয় বিদ্যুৎ বিভাগ। আর তাই প্রকল্পটি দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য তাকে সরিয়ে দিয়ে দক্ষ একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. জিয়াউল হাসান বলেন, এই প্রকল্পে আমি কোনো দুর্নীতি করি নাই। আমাকে কোনো সরিয়ে দিলেন তা আমি বলতে পারি না। যদি কোনো দুর্নীতি হয় সে ক্ষেত্রে ডিপিডিসি’র এমডি বলতে পারবেন। কারণ এই প্রকল্পের দায়িত্বে এমডি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষ লোকবলের সংকট ও সিস্টেম জটিলতা থাকতে পারে, তার জন্য আমি কেন দায়ী হবো?

বিজ্ঞাপন

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD