Logo

আন্তর্জাতিক কিডনি পাচারচক্রের টার্গেটে বাংলাদেশি দরিদ্ররা

profile picture
আল-আমিন
১ মে, ২০২৬, ১৫:৫৭
আন্তর্জাতিক কিডনি পাচারচক্রের টার্গেটে বাংলাদেশি দরিদ্ররা
ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়— ‘ইমার্জেন্সি এ-পজিটিভ প্রয়োজন’, ‘ও-নেগেটিভ ডোনার লাগবে’, কিংবা ‘পাসপোর্ট থাকতে হবে’— এমন নানা পোস্ট। প্রথম দেখায় এগুলো জরুরি রক্তের আবেদন বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব পোস্টের বড় অংশই আসলে রক্ত নয়, মানব অঙ্গ—বিশেষ করে কিডনি—কেনাবেচার গোপন সংকেত।

বিজ্ঞাপন

আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ফেসবুকের অসংখ্য ক্লোজড ও ওপেন গ্রুপে প্রকাশ্যেই চলছে কিডনি কেনাবেচার অবৈধ বাণিজ্য। এই ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ একাধিক দেশে বিস্তৃত একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট। তাদের প্রধান টার্গেট দেশের দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত ও অসহায় মানুষ। অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো হচ্ছে, পরে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে প্রতিস্থাপন।

‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী, নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে কিডনি বা অন্য অঙ্গের ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ বেআইনি। অর্থ বা অন্য সুবিধার বিনিময়ে অঙ্গ বিক্রি, কেনা, দালালি, বিজ্ঞাপন কিংবা প্রলোভন— সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তবে বাস্তবতা হলো, আইনের এই কঠোরতা উপেক্ষা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে অর্ধশতাধিক গ্রুপ। ‘কিডনি ডোনার’, ‘কিডনি বিক্রি’, ‘কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট’, ‘ডোনার হেল্প সেন্টার’— এমন বিভিন্ন নামে পরিচালিত এসব গ্রুপে সদস্য সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রেই এক লাখের বেশি। প্রতিদিন সেখানে শত শত পোস্ট দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কিডনির বাজারদর, দাতার ভাগ্যে সামান্য অর্থ

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একজন গ্রহীতার জন্য একটি কিডনি সংগ্রহ করতে খরচ হয় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা, কখনো কখনো আরও বেশি। নেগেটিভ রক্তের গ্রুপ হলে এই অঙ্ক এক কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের কিডনি বিক্রি করেন, তার হাতে পৌঁছায় মাত্র চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও কম। বাকি অর্থ চলে যায় দালাল, এজেন্ট, ফিক্সার, বিদেশি সমন্বয়কারী এবং মূল হোতাদের হাতে। জীবনের ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা এবং পঙ্গুত্বের আশঙ্কা— সবই বহন করতে হয় কেবল দাতাকেই।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই পাচারচক্র অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং অন্তত তিনটি স্তরে পরিচালিত হয়।

প্রথম স্তর: মাঠপর্যায়ের এজেন্ট

বিজ্ঞাপন

দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এজেন্টরা দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে টার্গেট করে। তারা কিডনি বিক্রির বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ, বিদেশ ভ্রমণ, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়। প্রতিটি দাতা সংগ্রহের জন্য একজন এজেন্ট প্রায় তিন লাখ টাকা পর্যন্ত কমিশন পায়।

বাংলাদেশজুড়ে এমন কয়েকশ এজেন্ট সক্রিয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গ, বিশেষ করে দরিদ্রপ্রবণ জেলাগুলো তাদের প্রধান টার্গেট।

দ্বিতীয় স্তর: ফিক্সার নেটওয়ার্ক

বিজ্ঞাপন

এই স্তরের সদস্যরা পাসপোর্ট, ভিসা, বিমান টিকিট এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকে। দাতা যাতে মাঝপথে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে না পারেন, সেজন্য তার ও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া হয়। প্রয়োজনে এগুলো ব্যবহার করে ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইল করা হয়।

প্রতিটি কেস থেকে তারা প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকে।

তৃতীয় স্তর: পাকিস্তানভিত্তিক রানার ও সমন্বয়কারী

বিজ্ঞাপন

দাতারা পাকিস্তানে পৌঁছানোর পর করাচি বিমানবন্দর থেকে তাদের গ্রহণ করে স্থানীয় সদস্যরা। তারা নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যায়, হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং অপারেশনের পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করে।

এই স্তরের ওপরেই অবস্থান করে চক্রের মূল হোতা বা ‘কিংপিন’। তারাই আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতা সংগ্রহ করে এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কিডনি সরবরাহের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।

বিজ্ঞাপন

ফেসবুকে কোডওয়ার্ডে চলছে বেচাকেনা

ফেসবুকের নজরদারি এড়াতে পাচারকারীরা এখন সরাসরি ‘কিডনি’ শব্দ ব্যবহার করে না। পরিবর্তে ‘কে’, ‘ও-পজিটিভ’, ‘ও-নেগেটিভ’ বা অন্য সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করা হয়। অনেকেই নিজেদের প্রোফাইলে ধর্মীয় উক্তি, হাসপাতালের লোগো কিংবা মানবিক বার্তা ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে।

পাকিস্তানে প্রতিস্থাপন, বাংলাদেশে সংগ্রহ

বিজ্ঞাপন

আগে ভারত ছিল এই অবৈধ প্রতিস্থাপনের অন্যতম গন্তব্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা জটিলতা বাড়ায় পাচারচক্র এখন পাকিস্তানের করাচিকে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে। সেখানে ছোট ছোট ক্লিনিক ও কিছু হাসপাতালের মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ফ্লাইটে দাতাদের করাচি পাঠানো হয়। অনেক সময় তাদের জানানো হয়, অপারেশনের পর দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই পরে আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়েন।

প্রশাসনিক সহযোগিতার অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই অবৈধ নেটওয়ার্কের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরে দাতাদের যাতায়াত সহজ করা, নথিপত্র যাচাইয়ে সহায়তা করা কিংবা তদন্তকে ভিন্নখাতে নেওয়ার মতো অভিযোগও সামনে এসেছে।

কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে বিদেশগামী যাত্রীকে ছাড়িয়ে নিতে সরকারি পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে। আবার মামলা হলেও অনেক সময় মূল হোতাদের নাম তদন্তে সামনে এলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

দুর্বল তদন্তে পার পাচ্ছে মূল হোতারা

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একাধিকবার দালাল ও মাঠপর্যায়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও চক্রের মূল পরিকল্পনাকারীরা অধিকাংশ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। কারণ, তারা সাধারণত সরাসরি যোগাযোগ করে না। হোয়াটসঅ্যাপ, বিদেশি নম্বর এবং স্তরভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে নিজেদের আড়ালে রাখে।

ফলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরাও অনেক সময় মূল হোতার পরিচয় গোপন রাখে বা সীমিত তথ্য দেয়। এতে তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে এবং অনেক মামলা শেষ পর্যন্ত দুর্বল চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্টে শেষ হয়।

প্রতারণার শিকার অসংখ্য তরুণ

অর্থকষ্ট, ঋণের চাপ বা জীবিকার অনিশ্চয়তায় পড়ে অনেক তরুণ এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন। তাদের অনেককে প্রথমে ঢাকায় এনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। এরপর ভিসা ও ভ্রমণের সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অনেকেই শেষ মুহূর্তে বুঝতে পারেন, এটি কেবল কিডনি বিক্রির বিষয় নয়; বরং মানবপাচারেরও বড় ঝুঁকি রয়েছে। কেউ কেউ সাহস করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হলেও অধিকাংশই নীরবে এই চক্রের শিকার হন।

হাসপাতালের নাম ব্যবহার, জাল নথির অপব্যবহার

দাতাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে দেশের কয়েকটি স্বনামধন্য হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ব্যবহার করা হয়। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি। পাচারকারীরা কেবল বৈধ পরীক্ষার সুবিধা নিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে।

এছাড়া, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দাতা ও গ্রহীতাকে আত্মীয় হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এর মাধ্যমে বৈধ প্রতিস্থাপনের আড়ালে অবৈধ অপারেশন সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক অনটন, ঋণ, মাদকাসক্তি এবং প্রতারণাই মানুষকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ায় অঙ্গ প্রতিস্থাপন জটিল হওয়ায় রোগীর পরিবারও অনেক সময় অবৈধ পথের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

তাদের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কঠোর নজরদারি, সীমান্ত ও বিমানবন্দরে কড়া তদারকি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে এই অপরাধ থামানো কঠিন হবে।

অঙ্গ কেনাবেচা, প্রলোভন, দালালি বা জোরপূর্বক সম্মতি আদায়— এসব অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

অন্যদিকে, কাউকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অঙ্গ অপসারণ বা পাচার করা ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’-এর আওতায় গুরুতর অপরাধ। এ আইনে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেউ যদি এমন প্রস্তাব পান বা কোনো চক্রের খপ্পরে পড়েন, তাহলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করতে হবে। পাশাপাশি সব ধরনের প্রমাণ— যেমন ফোন নম্বর, চ্যাট, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, পাসপোর্ট-ভিসা সংক্রান্ত কাগজপত্র— সংরক্ষণ করা জরুরি।

বিদেশে অবস্থানকালে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা নিতে হবে।

ফেসবুকের পর্দার আড়ালে পরিচালিত কিডনি বাণিজ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র। দারিদ্র্য, আইনি জটিলতা এবং দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে তারা অসহায় মানুষকে টার্গেট করছে।

একদিকে দরিদ্র মানুষ হারাচ্ছেন নিজের অঙ্গ, অন্যদিকে অসাধু চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এই ভয়াবহ অপরাধ দমনে সমন্বিত অভিযান, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD