আ. লীগের ‘শিলা’তে কাবু চট্টগ্রাম ওয়াসা

চট্টগ্রাম ওয়াসার দাপ্তরিক কাঠামোতে পদটি ‘জনসংযোগ কর্মকর্তা’র। কিন্তু তার প্রভাব যেন প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও ছাড়িয়ে। নাম কাজী নুর জাহান শিলা। চট্টগ্রাম ওয়াসায় তিনি এখন এক রহস্যময় ও বিতর্কিত চরিত্রের নাম। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাকরি পাওয়া, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঘিরে বিতর্ক, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য এবং সহকর্মীদের জিম্মি করে রাখার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যেন ছোট পদে থেকেও তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন ওয়াসার ‘টপ টু বটম’।
বিজ্ঞাপন
একই পদে দেড় যুগ: নিয়মের তোয়াক্কা নেই: সরকারি বিধি অনুযায়ী সাধারণত তিন বছর পর পর দায়িত্ব পরিবর্তন বা বদলির নিয়ম থাকলেও কাজী শিলা একই চেয়ারে পার করছেন প্রায় দেড় যুগ। ১৮ বছর ধরে একই পদে বহাল থাকায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে ওয়াসার ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। সহকর্মীদের অভিযোগ, তিনি অফিসে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। নিজের ইচ্ছেমতো অফিস করেন এবং তাকে শাসন করার মতো কেউ নেই বলে তিনি দম্ভোক্তি প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক কানেকশন ও সম্পদের পাহাড়: অভিযোগ রয়েছে, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের জেরে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। শিলার গ্রামের বাড়ি এবং মোসলেম উদ্দিনের বাড়ি একই এলাকায় (বোয়ালখালীর কদুরখীল)। তিনি নিজে বোয়ালখালী আওয়ামী মহিলা লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতেন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও তার প্রভাবে ভাটা পড়েনি। এখনো আওয়ামী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন তিনি। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
টেন্ডার ও নিয়োগে ‘কমিশন বাণিজ্য’ : অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ওয়াসার বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দিতে শিলা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। এমনকি অফিস সময়ের পর বিভিন্ন ভিআইপি রেস্টুরেন্টে এবং নিজের বাসায় ঠিকাদারদের সঙ্গে কমিশন নিয়ে বৈঠক করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আওয়ামী পন্থী ঠিকাদাররা এখনো তার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নিচ্ছেন বলে দাবি ওয়াসার সাধারণ ঠিকাদারদের। এছাড়া ওয়াসার বিভিন্ন নিয়োগেও তার হস্তক্ষেপ ও বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বিজ্ঞাপন
গোপন নথি ফাঁস ও সহকর্মীদের হয়রানি: নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা জানান, শিলা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অতি গোপনীয় নথি বাইরে পাচার করেন। তার হাতে জিম্মি হয়ে আছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তিনি বিভিন্ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করেন এবং মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। কেউ তার দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে নিজের অনুগত কিছু সাংবাদিকের মাধ্যমে ভুয়া সংবাদ পরিবেশন করে তাদের মানহানি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমডি-সচিবের নাম ভাঙিয়ে দাপট: সাবেক এমডি প্রকৌশলী এ.কে.এম ফজলুল্লাহর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন শিলা। অভিযোগ আছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ সখ্যতা গড়ে তুলে তিনি নিজেকে ‘অস্পৃশ্য’ করে রেখেছেন। এমনকি বর্তমান প্রশাসনের সচিব ও এমডির নাম ভাঙিয়েও বিভিন্ন ঠিকাদার থেকে কমিশন নিচ্ছেন তিনি। ওয়াসার ভেতরে গুঞ্জন রয়েছে, কোনো ব্যবস্থা নিতে চাইলে তিনি কর্মকর্তাদের গোপন তথ্য ফাঁস করার হুমকি দিয়ে থাকেন।
তদন্তের দাবি: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অদৃশ্য শক্তির প্রবাদে বহাল তবিয়তে আছেন কাজী নুর জাহান শিলা। এ নিয়ে ওয়াসার সিবিএ নেতা ও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্নীতি বন্ধ করতে শিলার বিরুদ্ধে দ্রুত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।
বিজ্ঞাপন
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: এসব অভিযোগের বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোয়ারা বেগম জানান, এই পদে প্রমোশনের সুযোগ নেই। উনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে সেটি ভিন্ন বিষয়। উনার নিয়োগই হয়েছে ২০০৪-২০০৫ সালের দিকে। ওয়াসার অভ্যন্তরীন তথ্য ফাঁসের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
অভিযুক্তের বক্তব্য: কাজী নুর জাহান শিলার কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া মাত্র মুঠোফোন কেটে দেয়, পরে একাধিকবার ফোন করেও তার সাথে যোগাযোগ স্থাপনা করা যায়নি।
দুদক বলছে, কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পেলে নিদিষ্ট প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা হয়। অভিযোগ কিংবা পত্রিকার সংবাদের ভিত্তিতে কমিশনের অনুমতিক্রম তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়। ওয়াসার ঐ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ কমিশনের অনুমতিক্রমে তদন্ত করা হবে।








