ভুয়া নিয়োগের ফাঁদে টাকা হারাচ্ছেন দেশের হাজারো তরুণ-তরুণী

চাকরির আশায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন করে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন দেশের হাজারো বেকার তরুণ-তরুণী। ‘ইউনিসেফ স্কুল’ নামে অস্তিত্বহীন একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ প্রতারণার জাল। আকর্ষণীয় বেতন, বিপুলসংখ্যক পদ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার নাম ব্যবহার করে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘ইউনিসেফ স্কুল’ নামে বাস্তবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। নেই কোনো ক্যাম্পাস, অফিস কিংবা অনুমোদনের তথ্যও। তবু ফেসবুকভিত্তিক বিভিন্ন চাকরির গ্রুপ ও পেজে প্রতিষ্ঠানটির নামে অসংখ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিগুলোতে একই ধরনের লোগো, পদবী ও বেতনের তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
বিশেষ করে শিক্ষিত বেকার তরুণদের লক্ষ্য করেই প্রতারকচক্রটি কাজ করছে। তারা ‘থানা শিক্ষা পরিদর্শক’, ‘ইউনিয়ন শিক্ষা পরিদর্শক’, শিক্ষক ও অফিস সহায়কসহ নানা পদে কয়েক হাজার নিয়োগের কথা উল্লেখ করছে। কোথাও ২৭ হাজার, কোথাও আবার ৪৬ হাজার টাকার বেশি বেতনের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: লুটপাটের স্মার্ট কৌশল প্রকৌশলী জিয়াউলের
বিজ্ঞাপন
প্রথমে আবেদনকারীদের ই-মেইলে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার বার্তা পাঠানো হয়। এরপর মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়। যোগাযোগ করলে প্রশিক্ষণ, থাকা-খাওয়া বা নিয়োগ প্রক্রিয়ার নানা অজুহাতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। টাকা পাঠানোর পরপরই বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের নম্বর ব্লকও করে দেওয়া হয়।

ঝিনাইদহের এক চাকরিপ্রার্থী জানান, দীর্ঘদিন চাকরি খুঁজতে খুঁজতে তিনি বিজ্ঞপ্তিটি দেখে আবেদন করেছিলেন। ইউনিসেফের নাম ও অফিসের ঠিকানা দেখে তার সন্দেহ হয়নি। পরে প্রশিক্ষণ ফি বাবদ বিকাশে ১৫ হাজার টাকা পাঠানোর পর আর কোনো যোগাযোগ পাননি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন রাজশাহী, ঝালকাঠি, গাইবান্ধা, রংপুর ও রাজবাড়ীর অনেক ভুক্তভোগী। কেউ টিউশনি করে জমানো টাকা হারিয়েছেন, কেউ ধার করে পাঠিয়েছেন প্রশিক্ষণ ফি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে এমন শতাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারকরা অত্যন্ত পেশাদার কৌশলে কথা বলে। তারা সরাসরি চাকরির জন্য টাকা চায় না; বরং প্রশিক্ষণ ও আবাসন খরচের কথা বলে অর্থ নেয়। এতে সহজেই বিশ্বাস করে ফেলেন চাকরিপ্রার্থীরা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রতারকচক্রটি ভুয়া ফেসবুক আইডি ও গ্রুপ ব্যবহার করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছড়াচ্ছে। অনেক গ্রুপে সদস্যসংখ্যা কয়েক লাখ হওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এসব পোস্ট। আবেদন গ্রহণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু ই-মেইল ঠিকানা। তবে কোনো অফিসিয়াল ফোন নম্বর বা প্রতিষ্ঠানের বৈধ তথ্য দেওয়া হচ্ছে না।
প্রতারকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তারা প্রথমেই আবেদনকারীর কোড নম্বর ও পরিচয় জানতে চায়। সাংবাদিক পরিচয় পেলেই নম্বর বন্ধ করে দেওয়া বা ‘ভুল নম্বর’ বলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে ইউনিসেফ বাংলাদেশ জানিয়েছে, ‘ইউনিসেফ স্কুল’ নামে তাদের কোনো প্রতিষ্ঠান নেই এবং এ ধরনের নিয়োগ কার্যক্রমের সঙ্গে সংস্থাটির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে একাধিকবার সতর্কবার্তাও প্রকাশ করা হয়েছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিসেফ কখনো চাকরির জন্য অর্থ নেয় না এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ব্যক্তিগত ই-মেইলের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে না। চাকরির বিজ্ঞপ্তি কেবল অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও স্বীকৃত মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডিজিটাল সচেতনতার ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে প্রতারকরা। চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতা ও বেকারত্বের কারণে অনেকেই যাচাই না করেই আবেদন করছেন। ফলে সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন তারা।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঠেকাতে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযোগ ও তদন্ত কার্যক্রম জোরদারেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।








