দুদকের মামলার পাহাড়, সাহস ও উৎসাহ পাচ্ছে দুর্নীতিবাজরা

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, কর ফাঁকি, সম্পদের তথ্য গোপন, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অর্থপাচার—এমন বহুমাত্রিক দুর্নীতির অভিযোগে নিয়মিত মামলা করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে বিপুলসংখ্যক মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকায় বিচারপ্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের জট।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে দুদকের মোট ১১ হাজার ৭৫৩টি মামলা দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যে বিচারিক আদালতে রয়েছে ৬ হাজার ৪৬১টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৪ হাজার ৯৫টি এবং আপিল বিভাগে ৭৪৫টি মামলা। এছাড়া উচ্চ আদালতের আদেশে ৪১৯টি মামলা স্থগিত রয়েছে।
নিয়মিত শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ চললেও মামলার নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম। ফলে প্রতিবছর নতুন মামলা যুক্ত হয়ে বিচারব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি সময়ে মাত্র ৩৩টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট বিচারাধীন মামলার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
ঢাকায় বিচারিক আদালতে ৮৬৫টি এবং ঢাকার বাইরে ২ হাজার ৯৩৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এমনকি বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলের ৩৩৫টি মামলাও এখনও ঝুলে আছে, যা দীর্ঘসূত্রতার চিত্র আরও স্পষ্ট করে।
বিজ্ঞাপন
মামলার দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে উচ্চ আদালতে রিট ও আপিলের প্রবণতা। অনেক অভিযুক্ত দুদকের নোটিশ ও তদন্ত প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যান। ফলে মূল বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকে।
দুর্নীতি মামলার নিষ্পত্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় উল্টো লাভবান হচ্ছে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো। বিচার না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে, অন্যদিকে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের সাহস ও উৎসাহ।
বিশ্লেষকদের মতে, “দ্রুত বিচার না হলে শাস্তির ভয় কমে যায়। ফলে দুর্নীতি দমন না হয়ে বরং আরও ছড়িয়ে পড়ে।” দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে অনেক অভিযুক্ত প্রভাব খাটিয়ে মামলার গতি ধীর করে, আবার কেউ কেউ সম্পদ সরিয়ে ফেলতে বা বিদেশে পাচার করতেও সক্ষম হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এ অবস্থায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত না হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
আইনজীবীদের মতে, “আইনের সুযোগ নেওয়া অভিযুক্তদের অধিকার হলেও অতিরিক্ত রিট ও আপিল বিচারপ্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে।”
নেতৃত্ব সংকটে স্থবির দুদক
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক সময়ে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের ফলে সংস্থাটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
কমিশনের অনুমোদন ছাড়া অভিযোগ অনুসন্ধান, নতুন মামলা দায়ের, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পত্তি ক্রোক কিংবা অভিযুক্তদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা—এসব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ বা ধীরগতির হয়ে পড়েছে। এতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নতুন মামলার ঢল
বিজ্ঞাপন
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দুদকের মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে ৪৫২টি নতুন মামলা দায়ের করা হয়।
এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দুই শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৩ জনে।
এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদসহ সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব এবং সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও এসব মামলার আসামি তালিকায় রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
দুদকের হাজারো মামলা থাকলেও আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানে বড় ধরনের উন্নতি হয়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) ২০২৫ অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম।
২০২৪ সালে এই অবস্থান ছিল ১৪তম। ১৮২টি দেশের মধ্যে ১০০-এর স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৪, যা বৈশ্বিক গড় (৪২) থেকে অনেক নিচে। যদিও স্কোরে ১ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে, তবে সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মামলা দায়ের নয়, দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তিই দুর্নীতি দমনের মূল চাবিকাঠি। এজন্য বিচারিক প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, এবং অপ্রয়োজনীয় রিট-আপিল কমানোর উদ্যোগ জরুরি।
বিজ্ঞাপন
একইসঙ্গে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে দুর্নীতিবিরোধী লড়াই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে না বলেও মত তাদের।
দুদকের মামলার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু নিষ্পত্তির গতি না বাড়ায় বিচারব্যবস্থায় চাপ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। নেতৃত্ব সংকট, আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না—এমন আশঙ্কাই জোরালো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।








