Logo

গণপূর্তে টেন্ডার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী তামজীদ

profile picture
বশির হোসেন খান
১২ মে, ২০২৬, ১৫:৫০
গণপূর্তে টেন্ডার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী তামজীদ
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৫ যেন পরিণত হয়েছে একটি অঘোষিত ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্যে’। সরকারি ইজিপি ও আইবাসের মতো স্পর্শকাতর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করছেন বহিরাগত ব্যক্তি এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে বিভাগটির নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজীদ হোসেনের বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর প্রত্যক্ষ মদদে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিল-ভাউচার প্রক্রিয়াকরণ, কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদার সিন্ডিকেট গঠন এবং আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লুটপাট সংঘটিত হচ্ছে। সম্প্রতি জনৈক আসাদ মাহমুদ নামের এক ব্যাক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অভিযোগ, সরকারি বিধি-বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভাগটির নির্বাহী প্রকৌশলী নিজের আস্থাভাজন বহিরাগতদের দিয়ে পরিচালনা করাচ্ছেন ইজিপি ও আইবাসের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজীদ হোসেনের ইজিপি ও আইবাস আইডির পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অফিসে বসেই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ওয়ার্ক অর্ডার আপলোড, বিল এন্ট্রি এবং আর্থিক নথি প্রক্রিয়াকরণের মতো স্পর্শকাতর কাজ করছেন আউটসোর্সিং কর্মচারী মিঠু নামের এক ব্যক্তি। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী এসব কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, হিসাব শাখাকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়ে পুরো আর্থিক নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী। তাঁর বিশ্বস্ত ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত মিঠু দীর্ঘদিন ধরেই এই অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। চট্টগ্রামে কর্মরত থাকাকালেও একই কৌশলে মিঠুকে ব্যবহার করেছেন তামজীদ। পরে ঢাকায় বদলি হয়ে আসার সময় তাকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বাস্তবে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কথিত ঠিকাদার দেলোয়ার হোসেন ভুট্টোর মাধ্যমে বিভাগটির অধিকাংশ লাভজনক কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ডিভিশনের বিভিন্ন প্রকল্পে এসি, লিফট, সাবস্টেশন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দোকান ও কোম্পানি ‘প্রেসক্রাইব’ করে দেওয়া হয়। ঠিকাদাররা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে মালামাল কিনলেও কমিশনের মোটা অংশ চলে যায় প্রভাবশালী চক্রের পকেটে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার বিল বছরের পর বছর ঝুলে থাকলেও সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের বিল অস্বাভাবিক দ্রুততায় পরিশোধ করা হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ধাপেই প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনিয়মের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে, গত অর্থবছরের প্রায় ৫ কোটি টাকার কাজ চলতি অর্থবছরের এপিপিতে (বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পরিকল্পিতভাবে সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দিতেই এ ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে।

বিভাগজুড়ে ‘লুটপাট সিন্ডিকেট’: অভিযোগ উঠেছে, বিভাগটিতে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী দুর্নীতি সিন্ডিকেট। এতে নির্বাহী প্রকৌশলীর পাশাপাশি কয়েকজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই), বহিরাগত ব্যক্তি এবং প্রভাবশালী ঠিকাদার জড়িত রয়েছেন। বিশেষ করে এক নারী এসডিই’র বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য ও কমিশন আদায়ের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ঠিকাদার। তাদের দাবি, বিল ছাড়, কাজ অনুমোদন ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে নির্দিষ্ট ‘পার্সেন্টেজ’ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, বিভিন্ন অভিযোগ বা অনুসন্ধান ধামাচাপা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। দুদক, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সম্প্রতি দুই সাংবাদিকের পরিচয় ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাজ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নির্বাহী প্রকৌশলী আত্মসাৎ করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঘুরেফিরে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পাচ্ছে, ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে বিভাগের ১০ জন কর্মচারী বহিরাগতদের অফিসে বসিয়ে সরকারি কাজ পরিচালনার প্রতিবাদ জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তারা অফিসের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। কিন্তু অভিযোগের পর উল্টো সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে বলে দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছেন তামজীদ হোসেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি প্লট, ফ্ল্যাট, গাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানে মিলেছে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ।

বিজ্ঞাপন

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজীদ হোসেন অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করছেন।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD