বন্ড সিন্ডিকেটের গডফাদার কামরুল

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বন্ড ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে ভয়াবহ দুর্নীতি, শুল্ক ফাঁকি, ঘুষ বাণিজ্য ও বিদেশে অর্থ পাচারের বিস্তৃত অভিযোগ উঠেছে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার মো. কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব লোপাট করছে।
বিজ্ঞাপন
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলাম এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ডিসি পূরবী সাহার নিয়ন্ত্রণাধীন বলে আলোচিত রাফায়েত ফেব্রিক্স ও এস ইসলাম হোম অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান মাত্র এক বছরেই প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সম্প্রতি ভুয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও তথ্য যাচাই ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড সুবিধা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরে এই রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ঘটনা দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এক ভুক্তভুগি।
অভিযোগ রয়েছে, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামালের বড় অংশই গোপনে চলে যাচ্ছে রাজধানীর ইসলামপুর, নয়াবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে। অথচ আইন অনুযায়ী এসব কাঁচামাল কেবল রপ্তানি পণ্য উৎপাদনেই ব্যবহারের কথা। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হচ্ছে বন্ড কমিশনারেটের ভেতরের একটি শক্তিশালী চক্রের মদদে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত মাসে রাফায়েত ফেব্রিক্সের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নজরদারি শিথিল করতে বিশেষ প্রভাব খাটানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রিভেন্টিভ নজরদারি প্রত্যাহারে চাপ প্রয়োগ করে একটি পত্র জারি করানো হয়, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে কার্যত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর বিনিময়ে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ লেনদেনের একটি অংশ সম্পন্ন হয় জাপানে।
বিজ্ঞাপন
সূত্রগুলো বলছে, গত ছয় মাসে কামরুল ইসলাম তিনবার জাপান সফর করেছেন। সেখানে তাঁর গাড়ির ব্যবসা ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ইউনিটকে ‘ম্যানেজ’ করতে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের দাবিও উঠেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার নোয়ানগর গ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম ৩০তম বিসিএসের মাধ্যমে কাস্টমস ক্যাডারে যোগ দেন। তবে সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে গুরুতর বিতর্ক। অভিযোগ রয়েছে, প্রশ্নফাঁস চক্রের মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভাইভায়ও সুযোগ পান তিনি। যদিও এসব অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ হয়নি।
২০১২ সালে এনবিআরে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর তাঁর প্রথম পদায়ন হয় চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে। পরে যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ায় বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দাবিকৃত অর্থ না দিলে মামলা, অভিযান ও হয়রানির মুখে পড়তে হতো।
কুষ্টিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহারকারী বিভিন্ন বিড়ি ও সিগারেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অনুসন্ধান বলছে, দুর্নীতির অর্থে তিনি অফিসে বিলাসবহুল সাজসজ্জা করেন এবং ব্যক্তিগতভাবে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। সে সময় দুদকের একাধিক অনুসন্ধানও হয়েছিল বলে জানা গেছে, যদিও শেষ পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে বদলি হওয়ার পর বন্ড খাতে তাঁর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, লাইসেন্স নবায়ন, অডিট রিপোর্ট অনুমোদন কিংবা বন্ড সুবিধা বহাল রাখতে ‘অনৈতিক সুবিধা’ দেওয়া এখন অনেকটাই অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “ফাইল জমা দেওয়ার পর নানা অজুহাতে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। পরে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে টাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। টাকা দিলেই সব ঠিক।”
অভিযোগ রয়েছে, বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নানা অজুহাতে হয়রানি করা হলেও ঘুষের বিনিময়ে অখ্যাত ও কাগুজে প্রতিষ্ঠান সহজেই বন্ড সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত রপ্তানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল বাগানবাড়ি, আধুনিক সুইমিং পুল এবং বিদেশে বিনিয়োগ, সব মিলিয়ে তাঁর সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি সিঙ্গাপুরে চলে যান বলেও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর মাধ্যমে শতকোটি টাকার বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতি ও রাজস্ব খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বন্ড খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে একটি অসাধু চক্র রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাধীন তদন্ত, ডিজিটাল নজরদারি এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যুগ্ম কমিশনার মো. কামরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।








