Logo

ডিপিডিসির এমডি নিয়োগে সক্রিয় ‘আওয়ামী বলয়’

profile picture
বশির হোসেন খান
২০ মে, ২০২৬, ১২:২৭
ডিপিডিসির এমডি নিয়োগে সক্রিয় ‘আওয়ামী বলয়’
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক, অস্বস্তি ও সন্দেহের ঘনঘটা।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, রাষ্ট্রের কৌশলগত বিদ্যুৎ খাতের এই শীর্ষ পদে নিয়োগ দিতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী ‘পুরোনো বলয়’, যারা অতীতের রাজনৈতিক আনুগত্য ও গোষ্ঠীগত স্বার্থকে পুঁজি করে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে এমডির চেয়ারে বসানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। এমডি নিয়োগ হলে রাষ্ট্রের অন্যতম বিদ্যুৎ বিতরণী এই প্রতিষ্ঠানটি স্বৈরাচারের মদদপুষ্ট কর্মকর্তার মুঠোয় চলে যাবে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সেই পুরোনো বলয়ই আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা পছন্দের লোককে এমডির চেয়ারে বসাতে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছে বিএনপি মতাদর্শের যোগ্য প্রার্থীদের। বাদপড়া এই প্রকৌশলীদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ শাসনামলে ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ডেসকো, ওজোপাডিকো, নেসকো ও ডিপিডিসিতে নির্বাহী পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বহুবার পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও বিএনপি করার অপরাধে নিয়োগ পাননি।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা, বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, লিখিত পরীক্ষার পর যেসব প্রার্থীকে ভাইভা ও প্রেজেন্টেশনের জন্য বাছাই করা হয়েছে, তাঁদের নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত তিনজনই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর নানা অভিযোগ অতীতে বিভিন্ন দপ্তরে জমা পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ডিপিডিসির এমডি নিয়োগ শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ডিপিডিসি সূত্র জানায়, গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন বিদ্যুৎ খাতের ৯ জন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডিপিডিসির সাবেক নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম, পিডিবির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জল হোসেন প্রামাণিক, ইজিসিবির নির্বাহী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান, পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ, ডেসকোর সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম, ডেসকোর সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. জাকির হোসেন, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আকরাম উল্লাহ, পাওয়ার সেলের সাবেক পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন, আরইবির সদস্য (প্রকৌশল) মো. আব্দুর রহিম মল্লিক। কিন্তু ফল প্রকাশের পর ভাইভা ও প্রেজেন্টেশনের জন্য নির্বাচিত করা হয় মাত্র তিনজনকে কিউ এম শফিকুল ইসলাম, মো. আমজাদ হোসেন এবং সৈয়দ আকরাম উল্লাহকে। আর এতেই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেও ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে কয়েকজন মেধাবী ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে। তাঁদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত অবস্থানের ভিত্তিতে একটি ‘অদৃশ্য ফিল্টার’ ব্যবহার করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ খাতের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন “এখানে মূল বিবেচনা মেধা নয়, বরং কার সঙ্গে কার সম্পর্ক সেটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাঁরা অতীতে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরাই সুবিধা পাচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন “বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। সরকার পাল্টালেও এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান অটুট রাখে। এখন আবার সেই বলয়ই সক্রিয় হয়েছে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শর্টলিস্টে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী প্রকৌশলী পরিষদ। সেই অভিযোগপত্রে উল্লেখ ছিল টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পদোন্নতি প্রকল্প ব্যয়ে অস্বচ্ছতা নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যদিও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক জবাব এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

বিদ্যুৎ খাতের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রকৌশলীরা ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে বিএনপি-সমর্থক হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাননি, যদিও তাঁরা বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকায় এগিয়ে ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

একজন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বলেন “ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যারা দলীয় পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালেও তাঁদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। বরং পুরোনো নেটওয়ার্ক আরও কৌশলী হয়েছে।”

ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিয়োগ সংক্রান্ত নথি বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয়নি। এতে জোরালো হয়েছে নিয়োগ স্থগিত বা বাতিল হওয়ার গুঞ্জন। ডিপিডিসির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম নিজেই দম্ভ বলে বেড়াচ্ছেন এমডি’র চেয়ারে আমি বসবো। অন্য কেউ বসতে পারবেন না।

একাধিক সূত্রের দাবি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অনানুষ্ঠানিক অনুসন্ধানও শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে জ্বালানি খাত বিশ্লেষক রাজু আহমেদ শাহ বলেন,“বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আনুগত্যকে যোগ্যতার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” তিনি আরও বলেন “ডিপিডিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিতর্কিত নিয়োগ হলে তার প্রভাব শুধু প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; নগর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”

এ বিষয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেন, “যে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। এখানে লিখিত পরীক্ষার নম্বর, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও বাছাইয়ের কারণ প্রকাশ করা উচিত।” তিনি বলেন,“গোপনীয়তার আড়ালে নিয়োগ দিলে বিতর্ক তৈরি হবেই।”

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের এক সাবেক সচিব মন্তব্য করেন,“সরকার পরিবর্তন হলেও বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো খুব একটা বদলায়নি। একই গোষ্ঠী নীতিনির্ধারণ থেকে নিয়োগ পর্যন্ত সবখানে প্রভাব বিস্তার করছে।” ডিপিডিসির এমডি নিয়োগকে কেন্দ্র করে এখন বিদ্যুৎ খাতে বিরাজ করছে উৎকণ্ঠা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সম্পন্ন হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে নতুন করে বিভাজন, অসন্তোষ ও প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুনভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে মূল্যায়নের দাবিও জোরালো হচ্ছে। এখন দেখার প্রকৌশলীরা বলছে, বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগ অভিযোগগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান ডিপিডিসির নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD